>আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতার সুন্দরতা

Posted: April 26, 2010 in ALL ARTICLE

>

আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতার সুন্দরতা

ড. র হ মা ন হা বি ব

বাংলাদেশের সাহিত্যে আবদুল মান্নান সৈয়দ (জ. ১৯৪৩ ও মৃ. ২০১০) সাহিত্য সমালোচক ও গ্রন্থ-সম্পাদক হিসেবে অধিক পরিচিত হলেও তিনি কিন্তু ঔপন্যাসিক, গল্পকার এবং নাট্যকারও। ষাটের এই লেখক কবি হিসেবেও বাংলা সাহিত্যে তাঁর কাব্যিক-নান্দনিক ভূমিকা পালন করেছেন।
আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ (১৯৬৭) কাব্যগ্রন্থের ‘অশোক-কানন’ কবিতার কবি জ্যোত্স্না, ভূত, নীলিমা, জন্ম, মৃত্যু, দোজখ ও ফুলকে বিভিন্ন মাত্রিকতায় মিশিয়ে একটি জৈবনিক স্বপ্নিল নান্দনিকতার আবহ সৃষ্টি করেছেন।
‘পাগল এই রাত্রিরা’ কবিতায় কবি আত্মদ্বন্দ্বে জর্জরিত এক কাব্য অস্তিত্বস্মারক জীবনানুসন্ধানী ব্যক্তিত্ব। কবি তাঁর নিজের আত্মা ও সত্তার সন্ধান করে চলেছেন উনিশ বছর ধরে। দর্পণের এপারে যে কবি; প্রতিচ্ছবির অন্যপারে কবির অন্য আরেক দ্বিমাত্রিক অস্তিত্ব রয়েছে। কবির মধ্যে চিন্তা ও মননের দ্বৈধের ভারসাম্যহীনতার নন্দনতত্ত্ব এই কবিতায় ভাষারূপ লাভ করেছে। কবির এক হাত টেনে ধরেছে শয়তান; অন্য হাত টেনে ধরেছেন ঈশ্বর। শুভ ও অশুভের দ্বন্দ্বে চরম দ্বান্দ্বিক অবস্থানে কবির কাব্য আত্মা জর্জরিত। কবি যেহেতু জীবন শিল্প রচনা করেন কবিতার মাধ্যমে; সে জন্য তিনি প্রচলিত ভাষা-ব্যাকরণ ও জীবন ব্যাকরণ মানেন না। জীবনের নতুন এক বৈচিত্র্যপূর্ণ ও অভিনব জীবনী-ব্যাকরণ রচনা করতে চান কবি, তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে। কবির জৈবনিক নান্দনিকতার মহীয়ান বিস্তার কবিতাটির মধ্যে ভাষারূপ লাভ করছে।
‘জীবন, আমার বোন’ কবিতায় কবি কৈশোরের নস্টালজিক অনুভবের প্রতি নান্দনিক আকর্ষণ অনুভব করেছেন। শিল্পের সৌন্দর্যের সমান্তরালতার মধ্যে কবি জীবন ও শিল্পের অবস্থানে নান্দনিকতাকে তুলে ধরেছেন। যৌবনের শক্তিমত্ত রূপের অনিবার্যতাকে কবি এখানে শৈল্পিক তাত্পর্যে জীবনবোধের গভীরতার প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেছেন।
কবির ‘জ্যোত্স্না-রৌদ্রের চিকিত্সা’ (১৯৬৯) কাব্যের ‘লণ্ঠন’ কবিতায় কবি যখন বলেন, ‘জাফরান রোদ সন্ধ্যার চিকুরে আঁচড়ায় সোনার চিরনি’ এবং ‘বিশ্ববাংলার ঘরে ঘরে ক্রমে আলো জ্বলে ওঠে’—তখন চিত্রকাল্পিক সৌন্দর্যই ভাষারূপ পায়। কবি যে ‘নিজের আগুনে’ তার লণ্ঠন জ্বালিয়েছেন, বলেছেন—‘এটি হলো কবির শিল্পচেতনার আগুন, যে সত্তার নিবিষ্টতা কবিকে শিল্পোত্তীর্ণ নান্দনিকতায় অবতীর্ণ করে।
‘মরণের অভিজ্ঞান’ কবিতায় কবি লিখেছেন—‘সবুজ চাঁদের নিচে পড়ে আছে আমার শরীর’ কবির এ ভাষ্যমধ্যদিয়ে তাঁর সৌন্দর্যচেতনার প্রবল প্রকাশ ঘটেছে।
মান্নান সৈয়দের ‘ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ’ (১৯৭৪) কাব্যের ‘ও চৈত্র ও ডানাঅলা ঘোড়া’ কবিতায় কবি যে উচ্চারণ করেছেন, পুরনো তরুশরীরের পত্র-পল্লবে মুকুলে-মঞ্জরিতে নতুন নির্মাণের মতো কবি হয়ে উঠবেন সম্পূর্ণ নতুন তরুর মতো অস্তিত্বময়—এখানে কবির শিল্প ও জীবন চেতনার নবায়িত রূপের নন্দনচেতনা স্পর্শায়িত হয়ে ওঠে। কবি তাঁর ‘স্বপ্নের অ্যানটেনা’ কবিতায় লিখেছেন যে, তার মাথার ভেতরে গোলাপ তার পাপড়ি মেলেছে এবং বাতাসে পাতা আছে কবির স্বপ্নের অ্যানটেনা—এতে কবির স্বপ্নপ্রবণ কাব্যিনতার সুন্দরতা অভিব্যক্ত। দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তর, অভাব ও দারিদ্র্য কবিকে এক জন্ম দিয়েছে; জীবনের ‘মহোত্থান’ যাতে কবিকে দ্বিতীয় জন্ম দেয়—কবির এ কথা বলার মধ্যে জীবনের মহাব্যাপ্তির সীমানায় কবির সুউন্নত অবস্থানই চিহ্নিত হয়। ‘দয়িতা কবিতা’ শীর্ষক কবিতায় কবি যে উচ্চারণ করেন, কেউ কেউ কবিকে অস্বীকার করলেও তাদের অস্বীকার করা পাথরের ওপর দিয়ে কবির ‘স্বচ্ছনীল তরল’ কবিতা বয়ে চলে—কবির এ দম্ভোক্তির মধ্যে তাঁর কাব্যিক আত্মবিশ্বাস প্রতিফলিত।
কবি তাঁর ‘আহত আমি অনাহত আমি’ কবিতায় লিখেছেন যে, কবি বারবার মানুষ কর্তৃক আহত হলেও কবির অন্তরাত্মার গভীরে এমন একটি ধ্যানী শক্তিকেন্দ্র আছে, যেখানে আঘাতের ক্ষতচিহ্ন পড়ে না, সেই অস্তিত্বের পাদদেশে পৌঁছে যায় সূর্যকর; ‘নেমে আসে চন্দ্রসম্প্রপাত’; সেখানে কবি কলঙ্কহীন চাঁদের মতো—আসলে সেটি হলো কবির সৃষ্টিসত্তার মর্মকেন্দ্র। কাব্যসত্তার মর্মাকাশে কবি নিজেই হলেন নিয়ন্ত্রক। এখানে কবির কাব্যিক আত্মবিশ্বাসের স্বাতন্ত্র্য স্পষ্টায়িত।
‘কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড’ (১৯৮২) কাব্যের নাম কবিতায় তিনি লিখেছেন যে, কবিদের কাব্যসত্তায় সামাজিক, রাজনীতিক, আধ্যাত্মিক, পার্থিব, নাগরিক, গ্রামীণ, প্রেমের, স্বপ্নের, বাস্তবের বা শরীরী কবিতার নির্মাণশৈলী আছে। কবির এ ভাষ্যমধ্যদিয়ে কবিতার যাত্রাপথ যে জীবনের ব্যাপকতর বোধের উত্তুঙ্গতার সঙ্গে জড়িত—তা অভিব্যক্ত হয়।
‘চামচা’ কবিতায় শক্তিহীন কবিরা যে রেডিও ও টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করার স্বপ্নে বিভোর থাকে; শিল্প ও জীবনচিন্তার প্রাতিস্বিকতাকে বাদ দিয়ে এ কথা বলেছেন। এতে প্রকৃত গভীর কবির প্রতিই কবির নান্দনিক পক্ষপাত স্পষ্টতা পায়।
‘লেখক’ কবিতায় কবিখ্যাতির লিপ্সাকে ধিক্কার দিয়ে লিখেছেন যে, যাঁরা প্রকৃত লেখক তাঁরা লেখকের সমস্যায় জর্জরিত না হয়ে মানুষ ও মানবতার সমস্যা সমাধানের জন্য তাঁদের কলম ধরেন। খ্যাতি বা পুরস্কারের লুব্ধতা তাদের ম্রিয়মাণ করতে পারে না।
‘আলোক সরকার আর অন্ধকার রায়’ কবিতায় কবিরাও যে ‘তেল-নুন-মাংসের হিসাব’ কষেন, সে কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কবিতাকেও যে শুধু ‘নারীলাবণিগ্রস্ত’ নয়; বরং ‘পৌরুষের’ হতে হবে—সে কথা উচ্চারণ করেন। এখানে জৈবনিক বাস্তবতার নান্দনিকতার কথা প্রকাশিত হয়েছে।
আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘পরাবাস্তব কবিতা’ (১৯৮২) কাব্যগ্রন্থের ‘জীবনানন্দ’ কবিতায় কবি লিখেছেন, কবি জীবনানন্দ জীবনের নির্মোহতাকে কাব্যায়িত করেছেন। কবির জীবনবেদনা থেকে ‘দূরে-দূরতরে’ জীবনানন্দ যাত্রা করলেন—বলাতে একজন কবির যাত্রাপথ ও জীবনদর্শন যে একেক রকম, সে ব্যাপারটিই প্রকাশিত হয়।
কবি তাঁর ‘নারী’ কবিতায় নারীকে শুধু ‘স্বর্গবিজয়ের তরবারি’ বলেননি; অধিকন্তু নারীকে ‘কৃষ্ণ মেঘ-মেঘালিতে সাঁতারু হাঁসের মতো’ ভাষায় কবির নন্দনচেতনার নবতর মাত্রা চিহ্নিত হয়। নারীর ভেতরে কবি পেয়েছেন ‘স্বর্গের মধু’। নারীকে তিনি বলেছেন, ‘নীলিমার চাষি’, ‘নক্ষত্রের তাঁতি’ এবং ‘বসন্তের সুকান্ত শ্রমিক’। কম্পোজিটার কীভাবে কবি হয়ে ওঠে, কবিতায় কবির দৃষ্টি ‘বেদনার গভীর ভিতরে’। জীবনের বেদনাবোধ থেকে কবি সৃষ্টি করেন শিল্পের নাদন। ‘সূর্যের ছেলে’ কবিতায় সব নির্জনতাকে চিরে ফেলতে চেয়েছেন। পাখির মতো পৃথিবীর সব দেশ তিনি ভেদ করে চলে যান—অর্থ হলো কবি শুধু স্বদেশের কবি নন; তিনি সব বিশ্বের মানুষের কবি। কবির ‘ভিতরে বইছে পৃথিবীর দীর্ঘতম নদী’—এই ভাষ্যমধ্যদিয়ে মানবসভ্যতার ব্যাপকতর অভিযাত্রা যে কবির কাব্যালোকে সমাসীন—তাই তিনি তুলে ধরেছেন।
‘পার্ক স্ট্রিটে একরাত্রি’ (১৯৮৩) কাব্যের ‘আবহমান বসন্ত’ কবিতায় কবি যে লিখেছেন ‘জীবনকে সহ্য করা’ হলে কবির নিজস্ব নিয়তি—এই ভাষ্যমধ্যদিয়ে কষ্টের পাহাড় পেরিয়ে শিল্পের সৌরভকে সৃষ্টি করার কথা কবি বলেছেন। কবি যে ‘নৈঃশব্দ্য’, ‘অপরাজিত অগ্নি’ ও ‘আশা’কে কামনা করছেন—এর মধ্য দিয়ে কবির জীবনব্যাপ্তির অপরাজিত আশাবাদের স্বপ্নই উচ্চকিত হয়ে ওঠে।
‘কলকাতা : ১৯৮২’ শীর্ষক কবিতা ১৫টি খণ্ড কবিতার সংকলন। এই কবিতার ৮ সংখ্যক কবিতায় লিখেছেন যে, কবি জীবনের সব অভিজ্ঞতা একে একে পার হয়ে ‘সমস্তের মধ্যে’ নিজে ক্রমাগত স্থিত হচ্ছেন। এই ভাবনায় কবিতা যে জীবনের সর্বব্যাপ্তিকে ধারণ করার স্পর্ধা রাখে, সেই নান্দনিক উত্কাঙ্ক্ষাই আসলে অভিব্যক্ত হয়। ১২ সংখ্যক কবিতায় কবি লিখেছেন—‘রবীন্দ্রনাথের চেয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতার সত্য বড়,’ ব্যক্তির চেয়ে নির্মিত শিল্প যে শিল্পের পরাকাষ্ঠায় অমরতা পায়—সেটিই এখানে ভাষারূপ লাভ করেছে।
‘কুসুম! কুসুম!’ কবিতায় যারা ‘শরীর সর্বস্ব’ এবং বস্তুর জন্য মাতাল, তাদের পক্ষে কবি তাঁর অবস্থানকে বিকৃত না করে চৈতন্যের গভীরতর অনুষঙ্গের সত্য নির্মাণই যে কবিতার অন্তসার, তা-ই ব্যক্ত করেছেন। কবির যে ‘নারী হৃদয়ের সূর্যাস্ত দেখার সাধ রয়ে’ গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন—এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে আসলে গভীর ব্যাপক জীবনতৃষ্ণার প্রতি কবির নান্দনিক আশাবাদই ভাষারূপ লাভ করে। ‘সোনালি গেলাশ’ কবিতায় কবি যে উচ্চারণ করেন : ‘আজ মনে হয় জন্ম জন্ম ধরে সঙ্গে আছে সুদূর বিদেশ’ তখন জীবন ও মনন ক্ষেত্র যে বিশ্বময় বিস্তৃত-কবির কাব্যমনোভূমির, সেই বিস্তৃত প্রেক্ষাপটই স্পষ্টায়িত হয়। ‘দুর্বোধ্যতা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—জীবনের ত্রিশ বছর পার হয়ে এসে কবি বুঝেছেন যে, ‘নৈঃশব্দ্য, শব্দের চেয়ে মহান অনেক।’ নীরবতা দিয়ে জীবনের আনন্দ ও বেদনার কথাকে পরমভাবে ব্যক্ত করা যায়। কবির গভীর জীবনীউত্তাপের নান্দনিকতা এখানে অভিব্যক্ত হয়েছে। ‘আপেল’ কবিতায় কবি নিজেকে ‘আশৈশব ঋণগ্রস্ত’ বলে মানবতার জন্য সৃজনশীলতাকে উপহার দেয়ার কথা বুঝিয়েছেন। ‘আজন্ম উদ্বাস্তু’ কবি ‘শব্দে ছন্দে-বেদনায় চেতনায়’ কবির ‘রক্তের ঋণ’ শোধ করে গেছেন তাঁর শিল্পরচনার মাধ্যমে মানবতাকে সেবা করার মধ্য দিয়ে।
‘মাছ সিরিজ’ (১৯৮৪) কাব্যের ‘বাহুবন্ধন ঊরুবন্ধন’ কবিতায় লিখেছেন, ‘রতিতৃপ্তির অন্তে আবার বিষাদে ভরেছে মন’ এর মধ্য দিয়ে মানুষের কামচেতনা যে ক্রমশ অগ্রগামী হয়ে অতৃপ্ত বেদনাময়তায় নিহত হয়, সে কথা বলেছেন। ‘রাস্তা’ কবিতায় লিখেছেন, কবির মনোরাস্তা নারীর শরীরে, কবরে, শ্মশানে, ঘাসের ভেতরে, সন্ধ্যার আকাশে এবং আশ্চর্য রাস্তায় গিয়ে মেশে। এখানে কবির নান্দনলোকের সম্প্রসারিত রূপের কথাই অভিব্যক্ত।
‘তুমি’ কবিতায় কবি ‘মৃত্যু ও জীবন’ এর পাহারা দেয়ার সঙ্গে কবির কাব্য-অস্তিত্বকে সমীকৃত করেছেন। তাঁর ‘চতুর্দশপদী’ (শ্রেষ্ঠ কবিতা, ১৯৮৭) কাব্যের ‘বুদ্ধপূর্ণিমা’, কবিতায় কবি জীবনকে ‘বুদ্ধের মতোন শান্ত মহাপরিনির্বাণের ধ্যানে’ স্থিত করে মহান-ব্যাপকতায় অনুভবের কথা বলেছেন। ‘নজরুল’ কবিতায় কবি নজরুলকে ‘বিদ্রোহী’ বলেছেন। তাঁর আগমনে ‘শীতরাত্রির সিল্কের লেপের আরাম’ অপসৃত হয়ে সমাজ-রাষ্ট্রের মানুষ যে ‘জাগ্রত, ক্রুদ্ধ, ক্ষিপ্ত, আনন্দিত মুগ্ধ’ এবং বিহ্বল হয়েছে—তা নান্দনিকতার ভাষ্যে বিবৃত করেছেন। ‘শবেবরাত’ কবিতায় কবি হলেন অন্তহীন এক তরুণ বালক, যিনি ‘জমিন ও নীলিমার শ্রেষ্ঠ রাত্রি’ শবেবরাতে নিমগ্ন থাকেন ‘রাত্রির অধিক কোন রাত্রিময়তায়’ অর্থাত্ আল্লাহর ধ্যানের মহানতম অভিনিবেশে; কারণ সেই রাত্রে বৃক্ষরাজি ‘বিনত সেজদায়’ স্রষ্টার সমীপবর্তী হয়।’ সে জন্য মানুষের উচিত আরও বেশি স্রষ্টার প্রতি সমর্পণশীল ও নিবেদিতচিত্ত হওয়া। ‘একটা মেয়ের হেঁটে যাওয়া’ কবিতায় ‘এক ঈশ্বর ছাড়া কে তোমাকে করবে দ্বিতীয় রচনা?’ ভাষ্যমধ্যদিয়ে নারীর নান্দনিক রূপস্নিগ্ধতার কথাই বিঘোষিত হয়েছে। ‘আত্মা’ কবিতায় লিখেছেন, মায়ের ‘পায়ের নিচে পড়ে আছে বেহেশত নীরবে।’ মায়ের আহ্বানে ধস্ত শতাব্দীর ম্রিয়মাণতায় ‘শুদ্ধতম বিশ্বাসের’ আলো জ্বলে ওঠে।
‘আমার সনেট’ (১৯৯০) কাব্যের ‘ফুল’ কবিতায় ফুলকে নারী, মণি, সোমা বলে অভিহিত করে নারী যে জীবনের অর্ধেককে খুলে; বাকি অর্ধেককে উন্মুক্ত করে না—নারী হৃদয়ের সেই রাহস্যিক নান্দনিকতার কথা প্রকাশিত হয়েছে।
আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর ‘সকল প্রশংসা তাঁর’ (১৯৯৩) কাব্যে আল্লাহর প্রশংসা করেছেন। ‘রাহমাতুলিলল আ’লামীন’ কবিতায় বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর প্রশস্তি গেয়েছেন বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। নবী (সা.)-এর শরীরকে কবি শরীর নয়; বরং ‘আত্মার দর্পণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। নবী (সা.) চাঁদ ও সূর্যের মতন এই পৃথিবীতে এমন ব্যাপক-গভীরভাবে ব্যাপ্ত হয়ে আছেন যে, পৃথিবীর সব জায়গায় অনাগত কাল ধরে তিনি প্রশংসিত হতে থাকবেন। ‘হজরত আবু বকর (রা.) : দৃষ্টিতে শ্রবণে’ কবিতায় ইসলামের প্রথম খলিফাকে সত্যের জন্য মহান দৃষ্টিবান বলে মন্তব্য করেছেন। ‘হজরত ওমর (রা.) : গোলাপে-ইস্পাতে’ কবিতায় কবি লিখেছেন, উমর (রা.) তাঁর ছেলেকে তার ভুলের জন্য বেত্রাঘাত করে মেরে ফেলেছিলেন; আবার সেই উমর (রা.)-ই দাসকে দিয়েছিলেন মানুষের সম্মান। ‘হজরত উসমান (রা.) : অজস্র প্রস্রবণ’ কবিতায় এই খলিফা যে আল্লাহর প্রতি ‘শান্ত স্থির আত্মসমর্পণ’ করেছিলেন, তা ব্যক্ত করেছেন। ‘হজরত আলী (রা.) : জ্ঞানের দরোজা’ কবিতায় কবি আলী (রা.)-এর প্রজ্ঞার গভীরতার প্রশংসা করেছেন। ‘সাহাবীরা’ কবিতায় নবী (সা.)-এর সাহাবীরা যে ‘যা-কিছু নশ্বর তার মধ্য দিয়ে অবিনশ্বরতা’কে রেখে গিয়েছেন; অর্থাত্ আল্লাহ-প্রেমের গভীরতায় তাঁরা যে সত্যসন্ধানী হয়ে পরম শান্তি লাভ করেছেন, সে কথাই ব্যক্ত করেছেন। এই কবিতাগুলোতে কবির আত্মিক ও আধ্যাত্মিক নান্দনিকতার মহীয়ান বোধ উচ্চকিত হয়েছে।
‘নীরবতা গভীরতা দুই বোন বলে কথা’ (১৯৯৭) কাব্যের ‘পঞ্চাশ বছরে’ কবিতায় উচ্চারণ করেছেন যে, ‘শিল্প! শিল্প! করতে করতে’ কবি তাঁর জীবন পার করে এখন ‘অতলান্ত জীবনের’ সিংহদ্বারে উপনীত। কত দ্রুত চলে এল ও খসে গেল জীবনের পঞ্চাশটি বছর। জীবনের গভীরতর বোধের প্রত্যাশা এই কবিতায় অভিব্যক্ত করেছেন। কাব্যটির নাম কবিতায় নীরবতা ও গভীরতা দুই বোন যেসব প্রশংসা আল্লাহর সে কথা ঘোষণা করে এবং আল্লাহকে পরম করুণাময় এবং ‘স্বর্গ মর্ত্য পাতালের প্রভু’ বলে পরমগভীরভাবে স্বীকার করে সে কথা কবি এখানে ব্যক্ত করেছেন। নীরবতা ও গভীরতার সঙ্গে আল্লাহর ধ্যানে নিবিষ্ট হওয়ার আধ্যাত্মিক নান্দনিকতার কথা কবি এখানে ব্যক্ত করেছেন।
আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘শার্শিকাচ’ কাব্যের কবিতাগুলো তাঁর অগ্রন্থিত কবিতার অন্তর্গত। এই কাব্যের ‘কবিতা যখন ফুরোলো’ কবিতার মধ্যে হৃদয় কাচে কেটে গেলেও কবিপ্রিয়াই যে কবির কাছে জীবন্ত কবিতা—সেই প্রেম ভাষ্য নান্দনিকতা এখানে স্পষ্টভাষিত হয়েছে। ‘তেসরা আবার’ কবিতায় কবি যে লিখেছেন, ‘হারিয়েছি সুন্দরের কতো আমন্ত্রণ!’ কবির এই ভাষ্যমধ্যদিয়ে অপসৃত সুন্দরের প্রতি কবির গভীর মনোবেদনা কাজ করায় কবি যে কত গভীর নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন—সেটিই মূর্ত হয়। ‘গাছ, তুমি কার?’ কবিতায় কবি গাছকে ‘পৃথিবীর আর মানুষের’ বলে ‘আখ্যায়িত করায় কবি ও শিল্পীরাও যে পৃথিবী; মানুষের জন্য নিবেদিত থাকেন—সে কথাই আসলে ব্যক্ত হয়। ‘জিনান-কে’ কবিতায় কবি ‘জীবন এক বিস্ময়!’ বলে জীবনকে অভিহিত করায় জীবনের রহস্যগভীরতা ও বিস্ময়কে উদ্ঘাটন করাই যে একজন নন্দনশিল্পীর কাজ—এই বিষয়টিই আসলে অভিব্যক্ত হয়। জীবনের বিস্ময় বিমুগ্ধতাকে আবিষ্কার করার উত্কাঙ্ক্ষার মধ্যে কবির গভীর ব্যাপক নন্দনপিপাসাই চরিতার্থতা লাভ করে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s