>রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে শেষ দেখা

Posted: April 30, 2010 in Abul Hossain, ALL ARTICLE

>

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে শেষ দেখা

আ বু ল হো সে ন
সেই দিনটা আজও চোখের সম্মুখে ভাসে। ঘটনাগুলো স্পষ্ট মনে পড়ে, কথাবার্তা কানে বাজে। চল্লিশ সালের মাঝামাঝি। যতদূর মনে পড়ে দিনটি ছিল ১৫ জুন, ১৯৪০। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের কথা। সেই যুদ্ধের ঘটনাবলীর খতিয়ান খুঁজে দেখলে তারিখটা সহজেই পাওয়া যাবে। তবে আমার নড়বড়ে স্মৃতিশক্তি এই তারিখটা বোধহয় ভুল করেনি।
আগের দিন অর্থাত্ ১৪ জুন পারির পতন হয়েছে। ফরাসি সেনাধ্যক্ষ জেনারেল ওয়াগি আত্মসমর্পণ করেছেন। জার্মান বাহিনী পারিতে ঢুকে পড়েছে।
খবরটা আমরা শুনিনি। সেদিন আমরা, আমি এবং অগ্রজপ্রতিম আকবর কবির ছিলাম পথে। সারাদিন হেঁটেছি। সকাল আটটা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত একটানা। মাঝেমধ্যে দু’চার মিনিট থেমে রাস্তার পাশে ভুটানি চায়ের দোকানে চা-বিস্কুট খাওয়া।
প্রথমে দার্জিলিংয়ের মল থেকে ঘুম হয়ে মংপু। আমরা মংপু গিয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথ সেখানে আছেন শুনে, তাঁকে দেখার আশায়। সরু উঁচুনিচু পাহাড়ি পথে ঠায় ১৮ মাইল হেঁটে মংপু পৌঁছে শুনি, রবীন্দ্রনাথ সেখানে নেই। তার আতিথ্যকর্ত্রী মৈত্রেয়ী দেবীও সপরিবারে উধাও।
তার বদলে দেখা হয়ে গেল আমার কলেজের (কলকাতা প্রেসিডেন্সি) প্রিন্সিপাল ড. বি. এম (ভূপতি মোহন) সেনের সঙ্গে। গরমের ছুটিতে তিনি মংপু গিয়েছিলেন তাঁর এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে। আমাদের দুরবস্থা দেখে ড. সেন আমাদের চা-পানি খাইয়ে, মংপু থেকে ৭/৮ মাইল দূরে কালিমপঙ যাওয়ার বড় রাস্তার ধারে একটা ডাক বাংলোয় পৌঁছে দিলেন গাড়ি করে, এই বলে যে, শেষ বিকেলে ওই পথে হেঁটে যাওয়া নিরাপদ।
রবীন্দ্রনাথের শরীর ভালো যাচ্ছিল না বলে তাকে মংপু থেকে কালিমপঙে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাতে দরকার হলে অবিলম্বে তাকে কলকাতায় পাঠানো সহজ হয়।
পাখির বাসার মতো ছোট এক টুকরো যে ডাক বাংলোয় আমাদের রাত কাটল তার প্রায় গা ঘেঁষে ২৫/৩০ ফুট নিচে দিয়ে বয়ে চলেছে একটা ছোট পাহাড়িয়া স্রোতস্বিনী, অনেকটা ঝরনার মতো। মলের বাজনার মতো নুড়ির ওপর দিয়ে পানি গড়িয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে শুনতে না কি সারা দিনের ধকলে বিছানায় পিঠ রাখতেই চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলো।
ভোর হতেই আবার হণ্টন শুরু। কালিমপঙ আরও ৮ মাইল দূরে। আমাদের পাশ দিয়ে মাঝে মাঝে বাস, ট্রাক, জিপ ছুটছে। আমরা দু’জন হাঁটছি। ইচ্ছা করেই গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করিনি। রোখ চেপে গিয়েছিল হেঁটেই যাব। দার্জিলিং থেকে মংপু যেতে গাড়িঘোড়া ছিল না। বন-জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সরু পাহাড়ি পথে হাঁটাই শ্রেয়। কিন্তু কালিমপঙের পথে যানবাহনের অভাব নেই। তা সত্ত্বেও কেন হেঁটে যাওয়া? রোখটা কিসের? আকবর কবিরের হিচ হাইকিঙের শখ। সেটাই আসল কারণ। আমি যাচ্ছি রবীন্দ্রনাথকে দেখার আশায়। আকবর কবির রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে আগে আসেনি, একবার কাছ থেকে নিজের চোখে দেখতে চান, কিন্তু পাহাড়ি পথে হাঁটতেই তাঁর সবচেয়ে আনন্দ। পথে তিনি দিশারী, আমি শুধুই তার সঙ্গী। ১৮/১৯ বছরেই এই বেহিসেবী কাণ্ডকারখানা সাজে।
হাঁটতে হাঁটতে কালিমপঙে গিয়ে যখন পৌঁছলাম তখন বেলা সাড়ে বারোটার মতো। মংপুতেই শুনেছিলাম রবীন্দ্রনাথ উঠেছেন গৌরিপুর মহারাজার বাড়িতে। সেই বাড়ি খুঁজে বের করতে দুপুর একটা বেজে গেল। এত কষ্ট করে শুধু এক নজর রবীন্দ্রনাথকে দেখতে এসেছি শুনেও তার সেক্রেটারির হৃদয় গলল না। কে ছিলেন সেই সেক্রেটারি মনে পড়ছে না। সুধাকান্ত? সে যাই হোক, তিনি বললেন, গুরুদেব কিছুক্ষণ আগে খেয়েছেন, এখন বিশ্রাম করছেন, এ সময় তাঁর সঙ্গে দেখা করা সম্ভব নয়। আপনারা পরের দিন আসুন। আমরা সেই দিনই আবারও হেঁটে দার্জিলিং ফিরে যাব। সেক্রেটারি মহোদয়কে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম। বারান্দায় ফিসফিস করে আমরা কথা বলছি, পাশের ঘরেই রবীন্দ্রনাথ বিশ্রাম করছিলেন। তিনি তখনও ঘুমোননি। বারান্দায় আমাদের কথাবার্তার শব্দ তাঁর কানে গিয়ে থাকবে। ভেতর থেকে তাঁর গলা শোনা গেল। সেক্রেটারিকে নাম ধরে ডেকে বলছেন, কে? সেক্রেটারি রবীন্দ্রনাথের ঘরে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসে বললেন, আসুন, গুরুদেব আপনাদের ভেতরে নিয়ে যেতে বলেছেন। তখন আর আমাদের পায় কে? এক মুহূর্তও দেরি না করে আমরা শোবার ঘরে ঢুকে দেখি একটা বিপুলাকার খাটে রবীন্দ্রনাথ শুয়ে আছেন, তার পা থেকে গলা পর্যন্ত একটা কালো চাদরে ঢাকা। মনে হলো ঘুমিয়ে আছেন। খাটের কাছে গিয়ে আমি আস্তে করে তাঁর পা ছুঁতেই তিনি চোখ খুলে আমাদের দিকে একবার তাকিয়েই আবার চোখ বন্ধ করলেন। আমরা তিনজন খাটের পাশে দাঁড়িয়ে। ঘরের ভেতর এক অসহ্য নীরবতা। কি করব বুঝতে পারছি না। অপেক্ষা করব, না বেরিয়ে যাব। এতক্ষণ আমরা একটা শব্দও করিনি। এমন সময় শুনতে পেলাম, রবীন্দ্রনাথ প্রায় অস্ফুট স্বরে কি যেন বলছেন, তাঁর ঠোঁট সামান্য কাঁপছে, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছেন। শুনেছো, প্যারিসের পতন হয়েছে। প্যারিস এখন ফ্যাসিস্টদের দখলে। আজ সকালে রেডিওতে শুনলাম। বিশ্বসংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র ধ্বংস হলো। সব আলো নিভে গেল। এখন যেদিকে চাই, দেখি অন্ধকার, শুধু অন্ধকার। অন্ধকার শব্দটি দু’বার বললেন। চোখ বুজেই বলছিলেন। আবেগে তাঁর গলা ধরে আসছিল। একটু থামলেন। আবার সেই দুঃসহ নিস্তব্ধতা। আমরা বোবার মতো দাঁড়িয়ে আছি ঘরে তিনটি থামের মতো। খানিক পরে রবীন্দ্রনাথ আবার চোখ মেলে বললেন, এখন আর বেঁচে থেকে কী লাভ? যেন আমাদেরকেই জিজ্ঞাসা করছেন। তারপর আর কোনো শব্দ নেই। রবীন্দ্রনাথ আবার চোখ বন্ধ করেছেন।
আমরা একইভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। যদি আরও কিছু বলেন। চার পাঁচ মিনিট কেটে গেল। রবীন্দ্রনাথ আর একটি কথাও বললেন না। মনে হলো বুঝি ঘুমিয়ে গেলেন।
আমরা নিঃশব্দে গুটিগুটি পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। সেই শেষ দেখা। শেষ কথা, বেঁচে থেকে আর কী লাভ?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s