>পরাবাস্তববাদ এবং আবদুল মান্নান সৈয়দ

Posted: September 16, 2010 in ALL ARTICLE

>

পরাবাস্তববাদ এবং আবদুল মান্নান সৈয়দ

চ ঞ্চ ল আ শ রা ফ

বাংলাদেশে, বাংলা ভাষায়, আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০) সেই নিজস্বপৃথক কবি, যিনি বদলে দিতে চেয়েছেন সমকালীন কবিতারুচিকে; তাঁর এই অভিপ্রায় ও সাধনা ভিত্তিহীন বা শূন্যগর্ভ নয়, এর একটা পটভূমি ও পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে। আমরা বেশ ভালো করেই জানি, তাঁর ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ (১৯৬৭), ‘জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা’ (১৯৬৯) এবং ‘ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ’ (১৯৭৪) রচিত হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপূর্ব শিল্পাদর্শ সুররিয়্যালিজম মেনে; জীবনানন্দ দাশ এবং তাঁর পরের বেশ কজন কবি এর কম-বেশি অনুগামী হয়েছিলেন। আবদুল মান্নান সৈয়দের নিকট-পূর্বসূরি শামসুর রাহমানও এই সংবেদনশীলতা ও আঙ্গিককে প্রকাশকৌশলের অংশ হিসেবে কখনো-কখনো মান্য করেছেন। কিন্তু ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ সুররিয়্যালিজমের খণ্ডিত অনুসরণ নয়, প্রকরণটি সমস্ত বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রামাণ্য হয়েছে। যুক্তির শৃঙ্খল ভেঙে অবচেতনের স্বাধীন পৃথিবীতে এর পরিক্রমা।
একটা জিজ্ঞাসা আমাদের সামনে চলে আসে : পরাবাস্তববাদে এই কবি কেন নিজেকে সমর্পণ করলেন? সম্ভবত তিনি লক্ষ করেছিলেন, বাংলা কবিতায় আধুনিকতা ও বৈশ্বিকতা সঞ্চার করেছে বিশশতকী শিল্পকলা; কিন্তু একক কোনো মতবাদের আকরণ ও বিস্তার বাঙালি কবির হাতে তখনও ঘটেনি। দ্বিতীয়ত, ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃতু্যর আগে’ (১৯৬০) ও ‘রৌদ্র করোটিতে’ (১৯৬৩)-এর পর থেকে শামসুর রাহমান সমকালীন বাংলা কবিতায় যে অনন্যতা ও শ্রেষ্ঠত্বের সঙ্কেত রেখে আসছিলেন, তার সামনে দাঁড়াতে হলে প্রয়োজন ছিল নিজস্বপৃথক একটা ভাষাকৌশল; কিন্তু এটা কোনো হঠাৎ-পাওয়া জিনিশ নয়, নবিশি পর্যায়ের কোনো উচ্চাভিলাষী কবির জন্যে তো নয়ই। নবীন আবদুল মান্নান সৈয়দ সুররিয়্যালিজমকে গ্রহণ করেছিলেন সমকালীন ভাষাপৃথিবীর মধ্যে নিজের স্বরটিকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়ার জন্যে। তৃতীয়ত, এই শিল্পমতবাদটি সাহিত্য, চিত্রকলা ও মানববিদ্যায় বেশ আগেই পরীক্ষিত, কেবল বাংলা কবিতায় এর পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা বাকি ছিল। কাজটি এই কবির হাতে সম্পন্ন হয়েছে। চতুর্থত, ইউরোপের অবরুদ্ধ সময়ের বাসিন্দারা ছিলেন এই শিল্পকলার অনুসারী; মান্নান সৈয়দও তাই; বাঙালির অবরুদ্ধ সময়ে রচিত হয়েছে তার সুররিয়্যালিস্ট কবিতাগুলো, যেমন ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা এই আঙ্গিকের কবিতা লিখেছেন গোটা স্পেন যখন কারাগার তখন। ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্সসহ ইউরোপের কিছু দেশের কবি-চিত্রকররা এই সংবেদনশীলতার দ্বারস্থ হয়েছিলেন; এমনকি, কমিউনিস্টরাও এতে সাড়া দিয়েছিলেন। তাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন অবরুদ্ধ সময়ের বাসিন্দা। কেননা, এর মূলকথা প্রচলিত যুক্তি ধারণায় আঘাত কেবল নয়, প্রতিষ্ঠিত সব মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। রাজনীতিও এর বাইরে নয়। ডাডাইজমের মতোই, সুররিয়্যালিজম অবরুদ্ধ সময়ের প্রকাশকৌশল।
এসব দিক থেকে, কেবল বাঙালির বিরুদ্ধ সময়ের রচনা হিসেবে বিবেচনা করলে আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ নতুন, আধুনিক ও খানিকটা বৈপস্নবিক। সে-সময়কার প্রচলিত কবিতাভাষার দিক থেকেও এমনটি বলা চলে। ‘অশোক-কানন’ শীর্ষক কবিতাটির সমর্থনই এখানে যথেষ্ট :

‘জ্যোৎস্না ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে দরোজায়, সব দরোজায়, আমার চারিদিকে যতগুলি দরোজা আছে সময়ের নীলিমার পাতালের ; জ্বলছে গাছসকল সবুজ মশাল; বাস একটি নক্ষত্র, পুলিশ একটি নক্ষত্র, দোকান একটি নক্ষত্র : আর সমস্তের উপর বরফ পড়ছে। এরকম দৃশ্যে আহত হয়ে আমি শুয়ে আছি পথের উপর, আমার পাপের দু’চোখ চাদ ও সূর্যের মতো অন্ধ হয়ে গেলো, আর যে-আমার জন্ম হ’লো তোমাদের করতলে মনোজ সে অশোক সে : জ্যোৎস্না তার কাছে ভূত কিন্তু একটি গানের উপর, দরোজা তার কাছে পুলিশ কিন্তু একটি জন্মের উপর, মৃতু্য তার কাছে দোজখ কিন্তু একটি ফুলের উপর ।।’
যে-আবহ কবিতাটিতে সৃষ্টি করা হয়েছে, রোম্যান্টিক কবির পক্ষে তা সম্ভব নয়। আধুনিকের অ্যান্টিরোম্যান্টিক দৃষ্টি এতে যেমন প্রবলভাবে মান্য হয়ে উঠেছে, তেমনি প্রকাশের স্বাভাবিক বা প্রচলিত শৃঙ্খলা পুরোপুরি লঙ্ঘন করা হয়েছে। নৈয়ায়িকতা বা কার্যকারণের তোয়াক্কাও করা হয়নি। ‘জ্যোৎস্না’ অ্যান্টিরোম্যান্টিকের কাছে প্রীতিকর কিছু নয়; ফলে, ‘ভূত’-এর উপমায় এটি হাজির হয়েছে। এরকম বহু উপমা পাওয়া যায় মান্নান সৈয়দের কবিতায় : ‘মানুষের গন্ধপাওয়া বাঘের রক্তের বোরখা-পরা ফোয়ারার আকাঙ্ক্ষার মতো’, ‘শাদা রাস্তার মতো, বেয়াড়া বৃক্ষের মতো তোমার কাছে নগ্ন এবং সমর্পিত’, ‘অনাব্য স্ত্রীর মতো কেবলি অন্যদিকে’ ইত্যাদি। এ-ধরনের পরাবাস্তব উপমা ও দৃশ্যকল্প বুঝিয়ে দেয় কবি এক অবরুদ্ধ সময়জগতের বাসিন্দা। সেই সময়ের বিপরীতে তিনি তৈরি করেন নিজের সময়; সেই পৃথিবীর বাইরে গিয়ে তিনি সৃষ্টি করেন প্রতিপৃথিবী। যেখানে প্রচলিত ভাষার কোনো স্থান নেই; যুক্তি এবং কার্যকারণেরও নেই। একে চিনতে বা অনুভব করতে পারলে আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতার মর্মে প্রবেশ ও ব্যাখ্যা সম্ভব হয়ে উঠবে।
রোম্যান্টিকদের নিয়তি মিস্টিসিজমে আত্মসমর্পণ_এই বক্তব্যের পক্ষে সবচেয়ে বড় উদাহরণ রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু অ্যান্টিরোম্যান্টিক কবিও যে মরমিপনায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে পারেন, তার দৃষ্টান্ত, বাংলা ভাষায় সম্ভবত সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আবদুল মান্নান সৈয়দ। ১৯৯৩ সালে তিনি প্রণয়ন করেন আস্তিক্য ও বিধাতাস্তবের কবিতাগ্রন্থ ‘সকল প্রশংসা তার’। ইউরোপে সুররিয়্যালিস্টদের অনেকেই আস্তিক্যকে তাদের প্রান্তগন্তব্য বলে সাব্যস্ত করেছিলেন। এই দলে বিশেষভাবে উলেস্নখযোগ্য গিওম অ্যাপোলিন্যাখ; মান্নান সৈয়দ তার সুশৃঙ্খল অনুসারী না হলেও পরমের ধারণায় আত্মসমর্পণের দিক থেকে তাঁর সঙ্গে ঐক্য রচনা করেুেছন। কিন্তু সুররিয়্যালিস্টদের বিধাতাবিশ্বাসী হয়ে পড়ার কারণ কী? খুব সহজ এর উত্তর; আন্দোলনটির ইশতেহারে এবং এর অনুশীলন থেকেই এটি পাওয়া যায়। আদ্রে ব্রেতো সুররিয়্যালিস্ট ইশতেহারের মধ্য দিয়ে আধুনিক শিল্পকলায় দুটি জিনিশ যোগ করেছিলেন : যুক্তিহীনতা ও অবচেতন। এ-দুটির অনুশীলনই অধিকাংশ পরাবাস্তববাদীকে আস্তিক্যের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। সত্য যে, যুক্তি ও সচেতন মনের স্থান যেখানে নেই, সেখানে আস্তিক্যই অবধারিত। পরাবাস্তববাদী মান্নান তাঁর আস্তিক্যের জানান দিয়েছেন তৃতীয় কবিতাগ্রন্থ থেকেই; অযুক্তি, আকস্মিকতা, বিস্ময়, বিশৃঙ্খলা ইত্যাদির ফাঁকে-ফাঁকে এতে বিশ্বাসের নানা অনুষঙ্গ কখনো-কখনো জেগে উঠেছে।
রবীন্দ্রনাথের মতোই, আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতার অন্তিমপর্ব বেশ নিরীহ। মরমিপনা থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক হওয়ার চেষ্টার মধ্য দিয়ে। চিত্রকলায় সেই লক্ষ্য তিনি পূরণ করতে পেরেছিলেন; কিন্তু মান্নান কোনো পথই ধরেননি মরমিপনা থেকে বের হওয়ার জন্যে। সম্ভবত, আস্তিক্যকে তিনি শেষ আশ্রয় বলে মেনেছিলেন। তবে কবিতার অন্তিমপর্ব যত নিরীহ হোক, এই কবি শুরুতে যে শক্তি ও উজ্জ্বলতা দেখিয়েছেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস তা গুরুত্বের সঙ্গে স্বীকার করবে বলে মনে হয়।
Source: Daily Ittefaq

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s