>নতুন কাব্যভাষার একজন কবি

Posted: October 6, 2010 in ALL ARTICLE

>

নতুন কাব্যভাষার একজন কবি

সৈয়দ আলী আহসান
আবদুল হাই শিকদারের প্রথম কবিতা বোধহয় সন্ধ্যার ছাদ। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান। ধানমন্ডিতে আমার সরকারি ভবনে একটি কাব্য পাঠের আসর বসেছিল। সেই আসরে আবদুল হাই শিকদার একটি নতুন ধরনের কবিতা পাঠ করলেন। কবিতাটি প্রাত্যহিকতার সংবাদে ভরপুর। আমি কবিতাটিতে একটি নতুন প্রয়াসের ইঙ্গিত পেলাম। প্রতিদিনের জীবনে মানুষের যত গ্লানি অথবা তত্পরতা আছে, সেগুলো দিয়ে কবিতা সুন্দরভাবে সাজানো যায়। এর ফলে জীবনের একটি মাত্রিকতা প্রকাশ পায়। মধ্যবিত্ত জীবনের আলো-অন্ধকার নিয়ে এই কবিতাটি রূপলাভ করেছে।
এরপর থেকে আবদুল হাই শিকদার অনেক কবিতা লিখেছেন এবং সব কবিতাই তার অত্যন্ত সান্নিধ্যের সংবাদ বহন করে। আমি তার এ কবিতাগুলো পাঠ করে আনন্দিত হয়েছি, বিশেষ করে এই জন্য যে, এসব কবিতার মাধ্যমে তিনি তার পরিচিত জীবনকে প্রকাশের উন্মুখ করে তুলেছেন। চিরন্তনতার পাশাপাশি তিনি জীবনের তাত্ক্ষণিকতায়ও বিশ্বাসী এবং তার বিভিন্ন কবিতার মধ্যে তাত্ক্ষণিকের আবেদন অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। তাত্ক্ষণিকতা একটি সত্য, আমরা তাত্ক্ষণিকতার মধ্যেই বাস করি এবং জীবনের সঞ্চয়গুলো সংগ্রহ করি। তাত্ক্ষণিকতা কোনো সাময়িকতা নয়, তাত্ক্ষণিকতা একটি সময়ের সঞ্চয়, সময় চলে যায় কিন্তু সঞ্চয়গুলো পড়ে থাকে। সেই সঞ্চয়ের কাহিনী এবং আবেগ তাঁর কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে।
আবদুল হাই শিকদার তার সাংবাদিক জীবনে এই জাতি, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানদের শিকড়ের সন্ধানী এবং এই শিকড়ের সন্ধান করতে যেয়ে তিনি কবি শাহ মোহাম্মদ সগীর, নবাব সিরাজউদ্দৌলার ইতিহাস সন্ধান করেছেন। মীর মশাররফ হোসেন, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, কাজী নজরুল ইসলাম এবং মোজাম্মেল হকের চিন্তা ও মননের অনুসন্ধান করেছেন। এক কথায় জীবন যে একসময় সত্য সন্ধানে প্রসারিত ছিল, আবেগময় ছিল, সেই জীবনকে তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এই জন্য তিনি বিতর্কিত হয়েছেন তথাকথিত আধুনিক বুদ্ধিজীবীদের কাছে।
আমাদের দেশে কিছু বুদ্ধিজীবী আছেন তারা নিজেদের জাতিক ও রাষ্ট্রিক অবস্থান নিয়ে গৌরববোধ করেন না, বরং অন্যদের সংস্কার ও ঐতিহ্যের সম্প্রসারণের মধ্যে নিজেদের প্রাণ খুঁজে পান।
এসব লোকের বিকল মানসিকতাকে উদঘাটন করার জন্য আবদুল হাই শিকদার নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন চিরটিকাল। সাংবাদিকতা তার পেশা। এবং এই পেশার কারণে তিনি বিভিন্ন সভায় বিভিন্ন সময়ে উপস্থিত হয়েছেন এবং যদি কখনও দেশবিরোধী ও মুসলমানবিরোধী কোনো কথা উচ্চারিত হয়েছে, তখন তিনি তার প্রতিবাদ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো এক শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে বঙ্কিমচন্দ্রকে দেবতা বানানোর প্রয়াস যে সভায় হয়েছে, সে সভায় তিনি উপস্থিত হয়ে তাদের প্রচারণার বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য লিখেছেন। আমার একটি ঘটনার কথা মনে আছে। বাংলা একাডেমীতে একবার জনৈক অধ্যাপক একটি বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। ওই বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল সম্পর্কে অনেক গ্লানিকর মন্তব্য ছিল, এই মন্তব্যগুলো অপ্রাসঙ্গিক ছিল।
আবদুল হাই শিকদার ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন এবং একসময় তিনি বামপন্থার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তারপরও তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন এসব মন্তব্যের। এভাবে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে তাকে আমরা পাই। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কমিউনিস্টরা মনে করে যে, ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে যারা কথা বলছে, তারাই একমাত্র প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। কিন্তু আমি মনে করি, জনজীবনের আকাঙ্ক্ষার বিপরীত কথা যারা বলেন, তাদের উক্তির প্রতিবাদ যারা করেন তারাই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।
আবদুল হাই শিকদার সেই অর্থে একটি প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর আমাদের সমাজে। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি কথায় লেখায় টেলিভিশনে সর্বসময় অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে এ জাতির অতীত সন্ধান করেছেন এবং সে হিসেবে তিনি আমাদের একজন শিকড় সন্ধানী বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। এই জন্য তাকে বহু অসুবিধা ভোগ করতে হয়েছে। চাকরি হারাতে হয়েছে এবং গুণ্ডা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। যার ফলে হাসপাতালে বেশ কয়েকদিন চিকিত্সাধীন থাকতে হয়েছে। এতদসত্ত্বেও তিনি দিশেহারা এবং নিশ্চুপ হননি। এসব অভিমত প্রকাশের জন্য তিনি কোনরূপ প্রত্যাশা করেননি। কেননা, তিনি সুযোগ সন্ধানী ব্যক্তি নন। আমাদের দেশে অনেক সুচতুর ব্যক্তি আছেন যারা সময়ের পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে নিজেদের মন্তব্য প্রত্যাহার করেন। তিনি সে রকম ব্যক্তি নন। প্রথম থেকেই তার যে মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে, এখন পর্যন্ত সে মানসিকতা বিদ্যমান রয়েছে। তার কবিতায় এই বিদ্যমানতার পরিচয় পাওয়া যায়। অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে তিনি তার বক্তব্য সাজিয়েছেন কবিতায়। একটি কবিতারম্ভে আছে :
‘চোখের দেখা ভুল হতে পারে
কিন্তু যা সব ঘটছে আজকাল সে তো মিথ্যে নয়।’
এই যে, সাম্প্রতিককালে যা ঘটছে তা নিয়ে তিনি মর্মাহত এবং সেই মর্মাহত অবস্থায় তিনি প্রতিবাদ করেছেন—অসৌজন্যের এবং অসত্ভাবের। যখন তিনি আহত হয়েছিলেন গুণ্ডার আক্রমণে, তখন হাসপাতাল থেকে একটি কবিতা লিখেছিলেন, তার একটি চরণ হচ্ছে—
‘একজন কবি যখন দাঁড়ান
তখন শরীয়তুল্লাহর শুভ্রতা চাঁদোয়ার মতো দুলতে থাকে আকাশে।’
আর একটি কবিতায় বলেছেন—
‘রাজপথে আজ লক্ষ মানুষ আগুন হয়ে ফোটে।’
একটি কবিতায় তিনি প্রশ্ন করেছেন—
‘কিন্তু হৃদয় সে কি কোন কালে কারো নিষেধ মেনেছে?’
আর একটি কবিতায় তিনি বলেছেন—
‘মানুষ বড় একলা এখন, মানুষ বড় একা,
এই কথাটি আমার বুকে রক্ত দিয়ে লেখা।’
এবং সেই মানুষের জন্য তিনি বলেছেন যে, তিনি তার সব সামর্থ্যকে একত্রিত করেছেন এবং তার নিজের উচ্চতার চেয়ে উচ্চকিত করেছেন কণ্ঠ। সেই কবিতায় তিনি বলছেন যে তিনি তার শব্দগুলোকে বলছেন, মানুষের অবয়ব থেকে ঘাম মুছে নিতে। সুতরাং সাধারণ মানুষ এবং সেই অর্থে যারা নিরীহ মানুষ সে মানুষদের জন্য তিনি তার কবিতার শব্দকে উচ্চকিত করেন। তার বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট। উপমা, উেপ্রক্ষা কিংবা রূপক নির্মাণে তার দক্ষতা ঈর্ষণীয়। কিন্তু কোনো উপমা, রূপক সাজিয়ে তিনি তার বলার কথাকে কোনোরূপ আড়াল করতে চাননি। উপমা, রূপকের ঘন ছায়ায় তার কবিতা একটি আচ্ছন্নতার সৃষ্টি করেছে কোথাও কোথাও।
তৈরি হয়েছে গভীর প্রতাপের একটি আবহ। কোথাও কোথাও নির্মিত হয়েছে অভিনিবেশের পরিচ্ছন্নতা। তারপরও তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্তমানে সমাজের সব অন্যায়কে প্রতিহত করার কথা বলেছেন, বেদনা ও ব্যর্থতার কথা বলেছেন। তিনি মাথা নত না করা এক নতুন কাব্য ভাষার কবি। তিনি তথাকথিত শ্রেণী-সংগ্রামী নন, মানবতাবাদী। তিনি একজন মুসলমান এবং বাংলাদেশের বাঙালি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার গৌরব আছে। তার মৃত্তিকা সন্ধানী চৈতন্য এই গৌরবের সঙ্গে বিধান করেছে শিল্পের সামঞ্জস্য। এদেশের মুসলমানদের জন্য যে অতীত আমাদের দেশে আছে সেই অতীতকে তিনি স্মরণ করতে চান এবং সেই অতীতের উপাদানগুলো তিনি তার সঞ্চয়ে রাখতে চান। একটি স্বাস্থ্যবান ভবিষ্যত্ নির্মাণের স্বপ্ন তিনি লালন করেন সর্বদা। সে জন্যই একটি কবিতায় তিনি বলেন :
‘আমার সন্তানদের জন্য দরকার
একটা খুব ভালো বাংলাদেশ… …
… … দোহাই বাংলাদেশকে কেউ দুঃখ দিও না
বাংলাদেশকে কেউ নোংরা করো না।’
আবদুল হাই শিকদারের মতো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে কোনো কবিই আমাদের দেশে কথা বলেননি। এই স্পষ্টতা একটি শিল্প, তার স্পষ্টতা কবিতার শব্দে শব্দে উত্কীর্ণ করেছে শিল্পের সমীহ। তার স্পষ্ট ভাষণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যেমন স্পষ্ট এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার তেমনি তার কবিতায়ও অকুশলের বিরুদ্ধে উচ্চারিত ধ্বনি-ব্যঞ্জনা অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। আমি তাকে আমাদের কবিতাঙ্গনে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। তার কথাগুলো প্রদীপ হয়ে আমাদের যেন আলোকিত করে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s