>কেন সাহিত্য?

Posted: October 20, 2010 in ALL ARTICLE

>

কেন সাহিত্য?

মা রি ও ভা র্গা স য়ো সা

অনুবাদ : একরামুল হক শামীম

মারিও ভার্গাস য়োসার এই লেখাটি ২০০১ সালের মে মাসে আমেরিকার রাজনীতি ও শিল্পকলা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘দ্য নিউ রিপাবলিক’-এ প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ এই প্রবন্ধে য়োসা সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় রেখে য়োসার এই লেখাটির সংক্ষেপিত অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো।

এটা আমার সঙ্গে প্রায়শই ঘটে। বইমেলায় অথবা কোনো বইয়ের দোকানে। হয়তো কোনো ভদ্রলোক আমার দিকে এগিয়ে এলেন এবং একটি অটোগ্রাফের আবদার করে বসলেন। ‘এটি আমার স্ত্রীর জন্য, আমার তরুণী কন্যার জন্য অথবা আমার মায়ের জন্য’ তিনি ব্যাখ্যা করে বসেন, ‘সে খুবই ভালো পাঠক এবং সাহিত্য খুব পছন্দ করে।’ পরমুহূর্তেই আমি জিজ্ঞেস করি_তাহলে আপনার ব্যাপারটা কী? আপনি কি পড়তে পছন্দ করেন না? প্রায়ক্ষেত্রেই একই ধরনের উত্তর আসে_ ‘অবশ্যই আমি পড়তে পছন্দ করি, কিন্তু আমি খুবই ব্যস্ত মানুষ’ আমি অনেকবার এই ধরনের যুক্তি শুনেছি। এই মানুষটি এবং এই মানুষটির মতো হাজারও মানুষের জীবনে এতোই গুরুত্বপূর্ণ কাজ পড়ে আছে, এতোই বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এতোই গুরুদায়িত্ব জমা রয়েছে যে, তারা তাদের মূল্যবান সময় উপন্যাসে, কবিতার বইয়ে কিংবা একটি সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মগ্ন হয়ে থেকে নষ্ট করতে চান না। বহুবিস্তৃত ধারণা হচ্ছে, সাহিত্য পরিহার্য কাজ। সুকুমারবৃত্তি ও ভালো আচার-আচরণের চর্চার জন্য সাহিত্য নিঃসন্দেহে চমৎকার ও হিতকর। কিন্তু মনে করা হয়, সাহিত্য এক ধরনের বিনোদন, এক ধরনের অলঙ্কার_যা মানুষ কেবল তার অবসর সময়ের জন্যই রেখে দিতে পারে। মনে করা হয়, এটি এমন কিছু_যা খেলার সাথে, চলচ্চিত্রের সাথে, তাস খেলা বা দাবা খেলার সাথে সমভাবে মানিয়ে নিতে পারে। যখন কেউ জীবন-সংগ্রামের অপরিহার্য কাজ ও দায়িত্বের অগ্রাধিকার ঠিক করে, তখন নিঃসঙ্কোচে সাহিত্যকে বিসর্জন দেয়।

স্পষ্ট মনে হচ্ছে, সাহিত্য ক্রমশই মেয়েলি কাজ হয়ে যাচ্ছে। বইয়ের দোকানে, সম্মেলনস্থলে অথবা লেখকের সাহিত্যপাঠের আসরে, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগে সাহিত্যের ক্লাসে পুরুষের তুলনায় নারীরা এগিয়ে। প্রথাগতভাবে এটি এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে, মধ্যবিত্ত নারীরা বেশি বই পড়ে, কারণ, তারা পুরুষদের তুলনায় কম কাজ করে। পাশাপাশি মনে করা হয়, কল্পনা ও ভ্রমের প্রতি পুরুষদের তুলনায় নারীরা সহজেই আকৃষ্ট হন। আমি এই ব্যাখ্যার প্রতি খুবই বিরূপ। এটি নারী-পুরুষের মধ্যে অযথা ব্যবধান তৈরি করছে। তবে সন্দেহ নেই, সাহিত্যের পাঠক তুলনামূলক কম এবং সেখানে নারী পাঠকের সংখ্যাই বেশি।

এমন পরিসংখ্যান সবএলাকার জন্যই প্রযোজ্য। উদাহরণস্বরূপ, স্পেনে সমপ্রতি একটি জরিপ চালিয়েছিল ‘জেনারেল সোসাইটি অব স্প্যানিশ রাইটার্স’। জরিপে বেরিয়ে আসে দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই কখনো সাহিত্যের কোনো বই পড়েনি। জরিপে আরও বেরিয়ে এসেছে, কমসংখ্যক পাঠকের মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। পুরুষ পাঠকের তুলনায় নারী পাঠকের সংখ্যা শতকরা ৬.২ ভাগ বেশি। এই নারীদের জন্য আমি আনন্দিত, অন্যদিকে সাহিত্যবঞ্চিত হাজার হাজার লোক, যারা পড়তে পারে; অথচ না পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের জন্য আমার সমবেদনা।

সাহিত্য না পড়ার জন্য তারা বিপুল আনন্দ আহরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে_কেবল এই জন্যই তাদের জন্য আমার সমবেদনা নয়। কারণ এই যে, আমি সচেতনভাবেই মনেকরি সাহিত্যবিহীন সমাজ অথবা যে সমাজে সাহিত্যকে অবহেলা করা হয়, সেখানে সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনযাপনে মননের গোপন ব্যাধি বাসা বাঁধে। সাহিত্যকে বিলাসবহুল শখ মনে করার যে ধারণা, তার বিপরীতে আমার অনেক যুক্তি রয়েছে। আমার দৃষ্টিতে সাহিত্য মনন বিকাশের অন্যতম প্রধান ও অতি প্রয়োজনীয় কাজ। আধুনিক ও গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকের সুষ্ঠু বিকাশ নিশ্চিত করতে অপ্রতিকল্পনীয় কাজ।

আমাদের সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ওইভাবে সংহত ভূমিকা পালন করতে পারেনি, জ্ঞানের অনির্দিষ্ট পথ ও বিকাশ প্রক্রিয়ার দ্রুতগতির কারণে। পরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে বিশেষায়িত জ্ঞানের উদ্ভব হয়েছে, দূর হয়েছে কুসংস্কার। কিন্তু সাহিত্য সেই শুরু থেকেই মানুষের অভিজ্ঞতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভাজক। সাহিত্য যতদিন টিকে থাকবে, ততোদিন এই গুণ বজায় রেখে চলবে। সাহিত্যের মাধ্যমেই মানুষ নিজের সত্ত্বাকে আবিষ্কার করতে পারে এবং পরস্পর সংলাপ পরিচালনা করতে পারে। মানুষে মানুষে সংলাপ পরিচালনায় সাহিত্যের গুরুত্ব অপরিসীম, সেখানে ভিন্ন পেশার লোক, ভিন্ন জীবনযাপনের লোক, তাদের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান, তাদের ব্যক্তিগত অবস্থান গৌণ বলে বিবেচিত। মোটের ওপর ভিন্ন পেশা, ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের ঊধের্্ব সাহিত্য।

জীবনযাপনে সাহিত্য একজন ব্যক্তিকে ইতিহাস ছাপিয়ে যেতে সহায়তা করে। সারভান্তেস, শেক্সপিয়র, দ্যন্তে ও তলস্তয়ের পাঠক হিসেবে আমরা তাদের লেখার সময় ও স্থানকে বুঝতে পারি। আমরা নিজেদের সেই সমাজের অন্তর্ভুক্ত করে থাকি। কারণ, লেখকের তৈরি কাজের ভেতরে আমরা মগ্ন হই। মানুষ হিসেবে আমাদের হিস্যা আমরা অনুভব করতে পারি। নানাধরনের ভেদাভেদের মধ্যেও সাহিত্য আমাদের নিকট কমন বিষয় হয়ে ওঠে। সাহিত্যের চেয়ে আর কোনোকিছুই মানুষকে দুরাগ্রহের বোকামি, সামপ্রদায়িক ভেদাভেদ, রাজনীতির উপদলীয়তা এবং একচেটিয়া জাতীয়তাবাদ থেকে কার্যকরভাবে সুরক্ষিত করতে পারে না।

সাহিত্যের চেয়ে ভালো শিক্ষা আমাদের অন্য কেউই দিতে পারে না। নৃতাত্তি্বক ও সাংস্কৃতিক ব্যবধান, মানুষের উত্তরাধিকারের চমৎকারিত্ব এবং নানামুখী সৃজনশীলতার মুখোমুখি হয়ে মানুষের স্পষ্ট প্রকাশের বিষয়গুলো সম্পর্কে সাহিত্য আমাদের জ্ঞান দেয়। ভালো সাহিত্যপাঠ নিঃসন্দেহে তুষ্টির অভিজ্ঞতা আনে। কিন্তু এটি পাশাপাশি অভিজ্ঞতা অর্জনের উপায়। আমরা কী এবং কিভাবে মানুষের শুদ্ধতা ও আমাদের মানবজীবনের অপূর্ণতা_এসব বিষয়েই অভিজ্ঞতা অর্জনের উপায়।

বোর্হেসকে যখন সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হতো, তখন তিনি খুব বিরক্ত হতেন। তার কাছে এটি বোকার প্রশ্ন মনে হতো। এমন প্রশ্নে তিনি জবাব দিতেন, কেউই পাখির গান কিংবা সুন্দর সূর্যাস্তের সৌন্দর্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে না। যদি এমন সৌন্দর্যময় বিষয়গুলো থাকে এবং যদি সেই সৌন্দর্যের প্রতি মন কৃতজ্ঞ হয়ে ওঠে, যদি এগুলো স্বল্পসময়ের জন্য হলেও জীবনকে কম বেদনার, কম অপ্রীতিকর রাখতে সাহায্য করে, তাহলে কেন এতো প্রায়োগিক প্রতিপাদন খুঁজতে যাওয়া? তবে প্রশ্নটি এক অর্থে ভালোই, কারণ তা ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে দেয়। এই জন্য যে, উপন্যাস এবং গল্প পাখির গানের সুমধুর সুরের মতো নয়; কিংবা দিগন্তে ডুবতে থাকা সূর্যের অপরূপ সৌন্দর্যের মতো নয়। কারণ, এগুলো দৈবক্রমে বা প্রকৃতির দ্বারা সৃষ্ট নয়। এগুলো মানুষের সৃষ্টি। সুতরাং এই প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক, কিভাবে এবং কেন সাহিত্য পৃথিবীতে এসেছে। এর উদ্দেশ্যই-বা কী? কেনইবা এগুলো এতোদিন টিকে থাকবে।

সাহিত্য জন্ম নেয় আকারবিহীন আত্মার মতো, লেখকের চেতনার অন্তরঙ্গতার ভেতর দিয়ে, চারপাশের দুনিয়ার প্রতি লেখকের সংবেদনশীলতার মধ্য দিয়ে, সর্বোপরি লেখকের অনুভূতির মাধ্যমে। সাহিত্য এমন বিষয় যেখানে লেখক, কবি বা বর্ণনাকারীর সাথে শব্দের লড়াই রয়েছে। এই লড়াইয়ের মাধ্যমেই সাহিত্য ক্রমশ রূপ, শরীর, গতি, ছন্দ, ঐকতান ও জীবন লাভ করে। মানুষের সৃজনশৈলী দ্বারা সৃষ্ট এক ধরনের জীবন, এক ধরনের কল্পিত জীবন, ভাষার তৈরি জীবন। কেউ কেউ মাঝেমধ্যে সাহিত্যের মধ্যে সেই সৃজনশৈলীর জীবনকে অনুসন্ধান করে বেড়ায়। কেউ আবার তা করে বিক্ষিপ্তভাবে। কারণ, বাস্তব জীবনে মানুষের অনেক অপ্রাপ্তি রয়েছে, মানুষ যেমন করে চায়, যা চায়, তা প্রায়শই পায় না। ব্যক্তিক কাজের মধ্য দিয়ে সাহিত্য টিকে থাকে না। সাহিত্য তখনই টিকে যখন অন্যরা একে গ্রহণ করে, যখন এটি সামাজিক জীবনযাপনের অংশ হয়ে ওঠে।

আমাদের গল্পের সমাপ্তি কিংবা ইতিহাসের সমাপ্তি এখনও লেখা সম্ভব হয়নি; এমনকি এটি পূর্বনির্ধারিতও নয়। এইজন্য পুরোপুরিভাবে আমাদের অনর্্তদৃষ্টি ও আমাদের ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়। আমরা যদি কল্পনাপ্রতিভা লুপ্ত হওয়ার ব্যাপারটিকে রুখতে চাই, যদি আমরা স্বাধীনতাকে ক্ষীণ হওয়া থেকে রক্ষা করতে চাই, তাহলে অতি অবশ্যই আমাদের সক্রিয় হতে হবে। আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে আমাদের অবশ্যই পড়তে হবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s