>আবদুল মান্নান সৈয়দ সূর্য গড়েছেন নিজের ভেতর

Posted: October 30, 2010 in ALL ARTICLE

>

আবদুল মান্নান সৈয়দ সূর্য গড়েছেন নিজের ভেতর

অ নু হো সে ন

এমন এক ঘর_যেখানে কৃত্রিম বাতির দরকার পড়ে না। তার দুটি দুয়ার আর অনেকগুলো জানালা। সামনের দুয়ারের চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরের ভেতর এক মানব-অবয়ব অস্তিত্ববান। আর অন্যটি? শরীরী প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ওই দুয়ারটিরও একদিন দরকার পড়ে খুলে দেওয়ার। ঘরের জানালাগুলো খোলা। প্রকৃতির উদার আলো-হাওয়া ঘরের ভেতরের অক্সিজেন ও বাতির অভাব দূর করে দেয়। শুরু হয়েছিল একটি কি দুটি দিয়ে। সময় গড়েছে, সৃষ্টির দুর্দমনীয় বান তার জানালার সংখ্যা করেছে অগণন।
ওপরের ছবির রূপকের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছেন প্রতিভাপাগল আবদুল মান্নান সৈয়দ ও তাঁর শিল্পসাধনার এক বিস্ময়কর জগতের গঠনকলা। সাড়ে চার দশক ধরে রূপাশ্রয়ী জানালাগুলো তাঁর কল্পনার সহযাত্রী হয়ে নানা মাত্রার রশ্মি ছড়িয়েছে এদেশের সাহিত্যে। তাঁর নামের আগে কোন অভিধা দিলে সইসই হবে_কবি, গল্পকার, গদ্যকার, প্রাবন্ধিক, সমালোচক বা আরো কিছু? সমকাল তাঁকে হয়তো বলবে, তিনি কবি কিংবা প্রতিষ্ঠিত গবেষক-গদ্যকার। কোনো একটিমাত্র বিশেষ অভিধায় তাকে অভিষিক্ত করা যাবে না। কারণ তাঁর শক্তি সীমাহীন কল্পনার শক্তি। একটিমাত্র নির্বাচিত পথে তিনি পড়ে থাকার মানুষ নন। অবিরত কল্পনার তাগিদে তিনি সাহিত্যের প্রায় সবগুলো শাখায় বিচরণ করেছেন। কোথাও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেননি একবারও। লেখকতার আবেগ তাকে শিল্পসৃষ্টির ডাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সারাটা জীবন।
সমকাল নির্দোষ বিচারক নয়। যিনি পরবতর্ীকালের আগাম অর্জন নিয়ে তাঁর সৃষ্টিসম্ভার দ্বারা সমকাল থেকে এগিয়ে থাকেন, তাঁকে সমকাল কোন পরিমাপক দিয়ে বিচার করবে? প্রচার-প্রপাগাণ্ডা সমকালকে নির্মোহ থাকতে বাঁধা দেয়। সমকাল যাকে-যা পুরষ্কৃত করে, কালের বিচার তা অনেকক্ষেত্রে মুছেও ফেলে। ইতিহাস ঘাঁটলে তার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য হবে না। সমকাল জীবনানন্দ দাশকে যা দিতে পারেনি, কাল তাকে তাই দিয়েছে, কালের বিচারে বিজয়ী হয়েছেন তিনি।
আবদুল মান্নান সৈয়দ বহুমুখী প্রতিভার অনন্যসাধারণ শিল্পী। শিল্পীর কাজ সৃষ্টি করে যাওয়া। মিডিয়াবাজির দৌড়ে আর দৌরাত্ম্যের কাছে বিকিয়ে দিয়ে নামডাক প্রতিষ্ঠা করা জাতশিল্পীর কাজ নয়। আজকাল প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা এমন একটি পর্যায়ে গেছে যে, এখন আর সৃষ্টিপ্রতিভা আছে কি নেই, সেটি দেখার বিষয় নয়। খ্যাতিমান হওয়ার লক্ষ্যে অনেকেই এখন প্রচারে মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য আজ প্রতিভা-থাকা অনিবার্য কোনো শর্ত নয়। পঞ্চাশ না পেরোতেই জন্মবার্ষিকী উদযাপনসহ নানা কাণ্ড ঘটানোর নজির দেখা যায় প্রায় সর্বত্র। সাহিত্যের একটি বড় পক্ষ আজকাল শিল্পোত্তীর্ণ কাজের চেয়ে স্বীকৃতি কুড়ানোর কাজে ব্যতিব্যস্ত। সমকালে অনেক কিছুই কুড়ানো যায়, পরের কাল তাকে টিকিয়ে রাখবে কি রাখবে না_এই সংশয় আর কাউকে উদ্বিগ্ন করে না।
মান্নান সৈয়দ লিখেছেন অবিরল। ১৯৫৯ সালে তদানীন্তন ইত্তেফাকের সাহিত্য সাময়িকীতে ‘সোনার হরিণ’ নামের কবিতা ছেপে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল, তবে তাঁর প্রকাশ ঘটেছে ষাটের দশকে। ষাটের দশক ছিল সাহিত্য আন্দোলন ও লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের মাধ্যমে নান্দনিক ইশতেহার জারি করার সময়। সেই সময়ের জোয়ারে যারা বেড়ে উঠেছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁদের সেরা একজন। নিজে ছোটকাগজের সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। ছোটকাগজের প্রতি তার নেশার প্রাবল্য দেখেছি পুরো আশির দশকজুড়ে। লেখার আমন্ত্রণ দাবি করে ছোটকাগজগোষ্ঠীর যারাই তার কাছে গেছেন, কাউকে ফিরিয়ে দিয়েছেন_এমন জানা যায়নি। কাগজের অস্তিত্ব ধরে রাখার জন্য ছোটকাগজগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের বিপুল উৎসাহ দিয়েছেন তিনি। শুধু আশির দশক কেন, নব্বই থেকে আমৃতু্য তিনি ফোল্ডার প্রকাশ করে নিজের সাম্প্রতিক সাহিত্যসহ নিজপ্রয়াসে আবিষ্কৃত তরুণ প্রতিভার লেখা ছেপে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন নিঃস্বার্থভাবে। যিনি যখন তার কাছে গেছেন প্রকাশিত এইসব ফোল্ডারাশ্রয়ী সাহিত্যকর্ম প্রচারের জন্য সানন্দে উপহার দিয়েছেন। ছোটকাগজের কাছে প্রথম হাতটি রেখে তার সকল সাহিত্যপ্রেমের সূত্রপাত। একসময়, আশির দশকের শেষপ্রান্তজুড়ে ছোটকাগজ করা ও লেখার জোয়ারে তিনি উন্মত্ত হয়ে ছিলেন। সে-সময় ছোটকাগজের স্বপ্নবিলাসী সতীর্থ তরুণদের প্রেরণাও দিয়েছেন অনেক।
মনে পড়ছে, ১৯৮৭ সালের মধ্য-জুলাই-এ মান্নান ভাইয়ের সঙ্গে হয়েছিল তুমুল আড্ডা। সে সময় তিনি এলিফ্যান্ট রোডের জেলা গেজেটিয়েট অফিসে কাজ করতেন। যতবারই গেছি তার সে অফিসে, দেখেছি ফর্মার পর ফর্মা নিজের প্রকাশিতব্য বইয়ের প্রুফ দেখছেন। স্বপ্নের আগুন বুকে করে সে-সময় আমরা কয়েক তরুণ ‘আড্ডা’ নামে একটি ছোটকগজ করতাম। মান্নান ভাইকে বলেছিলাম, আড্ডায় আমরা শিল্পের জাল বুনছি। আপনাকে তার অংশীদার হতে হবে। মান্নান ভাই পুরো হূদয়ের প্রেরণা ও প্রেম দিয়ে আমাদের পথচলার গতি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিলেন। সেদিনটি সম্ভবত হবে ১৩ কি ১৪ জুলাই। কাপভরতি চা খাওয়ার ফাঁকে তিনি আড্ডার জন্য ৩টি কবিতা লিখে রেখেছিলেন। বললেন, পছন্দমাফিক যে কোনো একটি নেওয়া যেতে পারে। ৩টিই ছিল মানের দিক থেকে অনন্য। তাদের থেকে একটি বাছাই করা বিরাট মুশকিলের কাজ। মনে আছে, ওই সময়ের তারুণ্য যৌনতার প্রসঙ্গমাখা বিষয়কেই স্পর্শ করেছিল বলে শেষপর্যন্ত নিয়েছিলাম ‘শরীর ফুরিয়ে যায়’ কবিতাটি। ‘আড্ডা’ বের হওয়ার পর প্রয়াত সাংবাদিক-কথাশিল্পী শেখ আবদুর রহমান এই কবিতার অসীম প্রশংসা করে একটি দৈনিকে কাগজটির সমালোচনাও লিখেছিলেন। ২৩ বছর আগে প্রকাশিত সে কাগজটির ওই সংখ্যা আজ আর আমার কাছে নেই। মান্নান ভাই এবার দুটি দৈনিকের ঈদ সংখ্যায় লিখেছেন তাঁর আত্মজৈবনিক লেখা। আমি যে দৈনিকে এখন কাজ করছি, তার ঈদ সংখ্যায় ছাপা হয়েছে একটি। এবার রোজার শুরুতে বেশ কবার গিয়েছি তার গ্রিন রোডের বাসায়। প্রসঙ্গত এলো সেই ‘আড্ডা’ প্রকাশের কথা। উনি পরের দিন আমাকে ফোনে জানালেন, ২৩ বছর আগের ‘আড্ডা’ এখন তাঁর লেখার টেবিলে। আমি অভিভূত হয়েছি! এরকম যত্ন করে সাহিত্যচর্চা আর কজন করেন আমাদের দেশে।
যে ধারার ভেতর বুঁদ হয়ে কাজ করেছেন তিনি, সে ধারাকেই তখনকার জন্য শ্রেষ্ঠ মনে করেছেন। কবিতার বই যখন করেছেন তার ভূমিকায় যা লিখেছেন, মনে হয়েছে কবিতাই তাঁকে জীবনের সব ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছে। কবিতাই সেরা, কবিতাই জীবন, কবিতাই চেতনার পরম শক্তি। আবার ১৯৮৭ সালে মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত নির্বাচিত গল্পের বইয়ে তিনি বলেছেন, ‘অনেকগুলো মাধ্যমে আমি কাজ করলেও ছোটগল্পই আমার সবচেয়ে প্রিয় মাধ্যম। গল্প লিখেই তৃপ্তি পাই সবচেয়ে বেশি।’ সমালোচনা সাহিত্যও তার হূদয়ের ফসল। সময়ের ছক এঁকে-এঁকে দিন-ক্ষণ ঠিক করে তিনি গবেষণা-সমালোচনার কাজ করেছেন। জীবনানন্দ দাশ নিয়ে লিখতে শুরু করেছেন ১৯৭১-এর পয়লা জানুয়ারি থেকে। বাংলা ভাষার সেরা কবির সম্পর্কে জানার বাসনা নিয়ে তিনি জীবনানন্দ চর্চায় ঝুঁকেছেন। নজরুলকে নিয়েও তিনি তুমুল লিখেছেন। আজকে গবেষণা-সমালোচনা সাহিত্যে নজরুল-জীবনানন্দের কথা এলে, সবার আগে যে নামটি দুই বাংলায় নিরঙ্কুশ কৃতজ্ঞতা নিয়ে উলেস্নখ করতে হবে, সেটি আবদুল মান্নান সৈয়দ।
দেশের সমালোচনা সাহিত্য ও গবেষণাকাজের একটি গড় দুর্বলতার দিক হলো, অধিকাংশ লেখক আলোচনা কিংবা গবেষণা করার কালে আলোচ্য রচনার সারফেসে ঘোরাঘুরি করেন, রচনার ইনার স্ট্রাকচারে খুব একটা কাউকে যেতে দেখা যায় না। সারফেস নিয়ে কথা বলা সহজ। সারফেস কি কোনো রচনার ভেতর-কাঠামোকে কেন্দ্রীভূত করে অন্তর্গত প্রাণশক্তি, স্পন্দন, গঠনকলা ও ভাষার সুষমাকে শনাক্ত করতে পারে? সারফেসের কাজ বাইরে থেকে মন্তব্য করা। সারফেস লেখার অন্তরাত্মাকে চিহ্নিত করতে পারে না। আমাদের সাহিত্যে ও গবেষণায় সারফেসমুখি উপরিতলের কাজ এত হয়েছে যে, পাঠকরাও এখন সারফেস আহরিত আলোচনায় অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। আকস্মিকভাবে কেউ সারফেসের বাইরে গিয়ে রূপতাত্তি্বক আলোচনা করলে অভ্যস্ত পাঠকদের পক্ষে তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা হোঁচট খেতে হয়। প্রসঙ্গক্রমে প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহারের একটি যথাযথ মন্তব্য উপস্থিত করছি, ‘ উন্নাসিকেরা যা বাদ দেন আবদুল মান্নান সৈয়দ তাকে নিয়ে আসেন বিবেচনায়; ফলে তার বিচার পায় ভিন্ন মাত্রা। সমগ্র বাংলাসাহিত্যের ভূগোল থাকে তাঁর সাহিত্য বিচারের পটভূমিতে।’ শিল্পের প্রধান শর্ত কেন হবে না নন্দনতাত্তি্বক বিশেস্নষণ কিংবা রূপতাত্তি্বক পর্যবেক্ষণ? যা সাহিত্যকর্ম তার অস্থিতে দাঁড়িয়ে থাকে রূপাবয়ব আর মজ্জায় ইমপিরিক্যাল তথ্যাদি। গঠনকলার পুরুত্ব ও প্রাবল্যকে ধরতে হলে দুই-ই দরকার_রূপাবয়ব ও সমাজতত্ত্বের অন্বয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুএকটি ব্যতিক্রম ছাড়া আমরা এগিয়েছি সমাজতাত্তি্বক মূল্যায়নের পথে। ফলে সাহিত্যকে তার অস্থিকলার দিক থেকে তুল্যমূল্য বিচারের নান্দনিক ধারা আর তেমনভাবে উপস্থিত করতে পারিনি। এদেশে দুটি নাম এক্ষেত্রে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়। একজন ভাষাতাত্তি্বক ড. হুমায়ুন আজাদ, অন্যজন আলোচ্য আবদুল মান্নান সৈয়দ। প্রথাধারীদের কাছে প্রথম ব্যক্তিটি বিতর্কিত হয়েছেন আর নবায়নশীল পাঠকের কাছে যুগের অনন্য শক্তিমান লেখক হিসেবে আচরিত হয়েছেন। একই ঘটনা আবদুল মান্নান সৈয়দের ক্ষেত্রেও অন্যভাবে ঘটেছে। সমালোচনাসাহিত্যে তিনি সমাজতাত্তি্বক পথে হাঁটেননি। রূপাবয়ব বিশেস্নষণের জন্য যেভাবে-যেটুকু সমাজতাত্তি্বক তথ্য দরকার, সেটুকুই তিনি তাঁর বিশেস্নষণ ও ব্যাখ্যায় অন্তভর্ুক্ত করেছেন। গবেষণা ও সমালোচনা কাজের ক্ষেত্রটিও তাঁর অনেক বিস্তৃত। অনেক লিখেছেন, অনেককে নিয়ে লিখেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য সবসময় পরম্পরার হাত ধরে এগিয়ে যায়। সাহিত্যের পরম্পরা নিয়ে নতুনভাবে বিশেস্নষণের কথা আজকাল কে ভাবেন? আমরা হয়তো তার সুস্পষ্ট কোনো উত্তর খুঁজে পাব না। সাহিত্যকে সমগ্র দিক থেকে ভাবা ও তাকে নিয়ে জীবনভর পরম্পরাগত মূল্যায়ন করার মানস কার আছে? সমকালে এর জবাবেও আবদুল মান্নান সৈয়দ ব্যতীত অন্য আরেকটি নাম খুঁজে পাওয়া দায়।
আবদুল মান্নান সৈয়দের সংবেদনা ও তাড়নার জগৎ তীক্ষ্ন, তির্যক ও সঞ্চরণমুখি। আবেগের আগুন তাঁকে মুহূর্তেই দাউদাউ করে জ্বালিয়ে দেয়। ঘটনার আবহে আবিষ্ট হওয়া তাঁর স্বভাব। ভাবনার অভিঘাতগুলো জমে তাঁর হূদয়ভূমিতে ক্রমাগত পলিময় হয়ে ওঠে। ফলে যে কোনো মুহূর্তে যেকোনো জায়গায় বসে তিনি অনায়াসে লিখতে পারেন। তাঁর জন্য কোনো প্রস্তুতির দরকার পড়ে না। অসুখবিসুখও তাকে বেঁধে রাখতে পারে না। ২০০৬-এর জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে তার সঙ্গে কথা হয়েছিল, তিনি ইন্টারভিউ দেবেন। দুর্ভাগ্যক্রমে সে-সময় তিনি হূদয়রোগে অসুস্থ হয়ে এনআইসিভিডিতে ভর্তি হন। কদিন পর ফোনে কথা বলে জানলাম, তিনি এখনো হাসপাতালের বিছানায়, কিছুটা সেরে উঠেছেন। তিনি ভুলে যাননি ইন্টারভিউর কথা। বললেন কাউকে পাঠিয়ে দেন, আমি আর অসুস্থ নই, আমি সাক্ষাৎকার দেব। সে-সময়টা ছিল তাঁর জন্মবার্ষিকের মাস। কথামতো সালিমা চৌধুরী শাওন সেদিন মান্নান ভাইয়ের এক ব্যতিক্রমধমর্ী ইন্টারভিউ নিয়েছিল। সেটি তখন আমাদের দৈনিকের সপ্তসিন্ধু পাতায় তার জন্মদিন উপলক্ষে ছাপা হয়েছিল। পরবতর্ী পর্যায়ে জানতে পারি, মান্নান ভাই অতি যত্নে সেটি তাঁর বইয়েও অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন সম্পূর্ণ সক্রিয় এক মানবচরিত্র। যাঁকে ভালো লাগত, তাঁর জন্য হূদয় উজাড় করে দিতেন। আড্ডাবাজি করার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানাতেন তাঁর বাসায়। কখনো নিজেও দেঁৗড়ে বেড়াতেন কতকগুলো পছন্দের জায়গায়। শাহবাগের দোতলায় সাহিদুল ইসলাম বিজুর কাছে, কোনো রেস্টুরেন্টে কিংবা কোনো দৈনিকের অফিসে। ২০০৮-এ রোজার মাসে যখন আমরা ঈদ ম্যাগাজিন করা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত, মান্নান ভাই আমাদের কাজের সহচারী হয়ে উঠেছিলেন। আমরা তখন ছেপেছিলাম তাঁর লেখা ডায়েরি। অপরের ওপর নির্ভর করলে পরে সেটিতে থাকবে হাজার ভুলের সমাহার তা তিনি ভাবতেই পারতেন না। ছাপা তাঁর যথাসম্ভব নিভর্ুল হওয়া চাই। সেই লক্ষ্যে এবং আনন্দে প্রুফ দেখার জন্য রোজার মাসে দিন-সাতেক গিয়েছিলেন আমাদের দৈনিকের অফিসে। বলেছিলাম, মান্নান ভাই, আপনার জন্য গাড়ি পাঠাই। উনি তা সরাসরি প্রত্যাখান করেছেন। নিজ দায়িত্বেই তিনি তাঁর ক্ষয়িষ্ণু শরীর নিয়ে কোথাও যাওয়াতে আনন্দবোধ করতেন। তিনি যে-লেখা পড়ে অভিভূত হতেন, ফোন খরচ করে তা নিয়ে কথা বলতেন মিনিটের পর মিনিট, কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টাও। ২০০৯-এর শুরুর দিকে আবদুল মান্নান সৈয়দ আর কবি বেলাল চৌধুরী আমার অফিসে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য দিনভর সাহিত্য-আড্ডা। সঙ্গে সহচর ছিলেন মান্নান ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নজরুল গবেষক ও সাংবাদিক রেজাউল করিম তালুকদার। দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি আড্ডা চলেছে সেদিন। সেদিন মনে হয়েছিল মান্নান ভাইয়ের শুধু হূদয়ী সংরাগ নয়, অস্তিত্বশীল থাকার শারীরিক অবস্থাও অনেক ভালো আছে। কে ভেবেছিল মান্নান ভাই এত দ্রুত আমাদের ছেড়ে অনন্ত দূরের দেশে হারিয়ে যাবেন। চাকুরিসূত্রে যেখানে যে-দৈনিকে ছিলাম লেখার কাজে আড্ডার আমেজ নিয়ে মান্নান ভাই সেখানে গিয়েছিলেন। তাঁর উপস্থিতি আমাদের সময়গুলোকে মধুর স্মৃতিবহ করে রেখেছে। আবদুল মান্নান সৈয়দকে যাঁরা ভেতর থেকে জানেন না, তাঁরা তাঁকে খুব স্বাভাবিকভাবেই বলে থাকেন যে তিনি রাশভারি দাম্ভিক স্বভাবের মানুষ। তাঁর কাছে যাঁরা গিয়েছেন তাঁরা জানেন তাঁকে অন্যরকমভাবে। একদম দিলখোলা বন্ধুতা আর সাহিত্যপ্রাণতাই তাঁর বড় পরিচয়।
ঈদে প্রকাশের জন্য ধুমছে আত্মজীবনীমূলক লেখা লিখেছেন। একটি দৈনিকে সম্প্রতি তরুণ কবি শিমুল সালাহ্উদ্দিন তাঁর এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারও ছেপেছেন। কথা ছিল ৫ স্বেম্বের ২০১০ আবদুল মান্নান সৈয়দের গ্রিন রোডের বাসায় যাব। তিনি নিজ আগ্রহেই বলেছিলেন সেদিন ৪টি কবিতা দেবেন ছাপার জন্য। ঈদের জন্য আত্মজৈবনিক লেখা শেষ করার পর তিনি এই ৪টি কবিতা লিখেছেন। সম্ভবত এই ৪টিই তাঁর শেষলেখা। ৫ তারিখ ৭টার দিকে ভাবছিলাম কবিতাগুলো নেওয়ার জন্য পরের দিন যাই। আমার উদ্দেশ্য ঈদ ম্যাগাজিনের সৌজন্য কপি ও সম্মানিসহই একবারে তাঁর কাছে কবিতা নেওয়ার জন্য যাব। ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে একটি চ্যানেলের তরুণ প্রযোজক ও কবি মামুন খান ফোন দিয়ে জানাল, ‘অনু ভাই, মান্নান স্যারের খবর শুনেছেন। উনি আর নেই।’ ওই সময় সাংবাদিক মাহমুদ আল ফয়সালের কক্ষে ড. সরকার আমিন, সাংবাদিক আবু তাহেরসহ আমরা কজন বসে ইফতারশেষে চা খাচ্ছিলাম ও বড় টিভির পর্দায় খবর দেখছিলাম। তখনও টেলিভিশনের পর্দায় খবরটি আসেনি। আমি মান্নান ভাইয়ের ফোনে ডায়াল করার সঙ্গে সঙ্গে ধরলেন তার মেয়ে জিনান। বললেন, ‘আমার বাবা মরেনি, সবাই ভুল বলছে।’ মামুন খান বাংলামটরের কাছাকাছি অবস্থান করছিল। তাকে ফোন দেওয়ার ৫ মিনিটের মধ্যে আমাদের জানায়, ল্যাব এইড থেকে তাঁর মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে এনে গ্রিন রোডের বাসার নিচে রাখা হয়েছে। আমি তক্ষুনি মতিঝিল থেকে চলে যাই নিশ্চুপ-নিথর অন্য এক আবদুল মান্নান সৈয়দের কাছে। বুঝলাম মেয়ে শোকে কাতর হয়ে এমন কথা বলেছিলেন। প্রফেসর মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ, প্রফেসর আবদুলস্নাহ আবু সায়ীদ, আহমাদ মাযহার, সায্যাদ আরেফিন, রুবাইয়াৎ আহমেদ, খন্দকার সোহেল, সোহেল হাসান গালিব, তারিক টুকু, নির্লিপ্ত নয়ন, শাহাদৎ রুমন ও পিয়াস মজিদসহ অগণিত তরুণ লেখক ও সাংবাদিক সে সময় তাঁর মরদেহর সামনে ভিড় জমিয়ে আছে। আমার আর মান্নান ভাইয়ের হাত থেকে তাঁর জীবনের শেষ ৪টি কবিতা নেওয়া হবে না!
পরের দিন বাংলা একাডেমীর নজরুল মঞ্চে নজরুল-গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দের নিথর দেহ রাখা হল। সৈয়দ শামসুল হক, ড. রফিকুল ইসলাম, বেলাল চৌধুরী, সংস্কৃতি সচিব হেদায়েতউলস্নাহ আল মামুন, একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, আনোয়ারা সৈয়দ হক, রামেন্দু মজুমদার, মনসুর মুসা, হারুন, হাবীব, আসাদ চৌধুরী, রবিউল হুসাইন, হাবীবুলস্নাহ সিরাজী, রবীন্দ্র গোপ, রশীদ হায়দার, এখলাসউদ্দিন, ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, আল মুজাহিদী, ম. হামিদ, খিলখিল কাজী, শিহাব সরকার, মুজিবুল হক কবীর, ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ, হাসান হাফিজ, নাসির আহমেদ, পুলক হাসান, মনজুরুর রহমান, রেজাউদ্দিন স্টালিন, অনিন্দিতা, সরকার আমিন, মনি হায়দার, আমিনুর রহমান সুলতান, ব্রাত্য রাইসু, মজিদ মাহমুদ, ড. তপন বাগচী, শামীম রেজা, জাফর আহমদ রাশেদ, সাখাওয়াত টিপু, হামীম কামরুল হক, আমিনুল রানা, সাইমন জাকারিয়া, ফেরদৌস মাহমুদ প্রমুখসহ আগের দিন যাঁরা মান্নান সৈয়দের বাসায় গিয়েছিলেন তাঁদের অনেকে উপস্থিত হন বর্ধমান ভবনে। ১২টায় জানাজা শেষ হলে প্রফেসর মোহাম্মদ হারুন-উর রশিদকে ঘিরে আমরা কজন কথা বলছিলাম। হারুন স্যার অত্যন্ত দামি একটি মন্তব্য করলেন যা আবদুল মান্নান সৈয়দের সাহিত্যকর্মের জন্য এক বড় সত্য, ‘মান্নানের স্মৃতিশক্তি ছিল অতুলনীয়, শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে দখলও ছিল ঈর্ষণীয় পর্যায়ের, যার ফলে সাহিত্যের যেকোনো বিষয়ে তিনি প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সকলের সামনে নিভর্ুল ও যথাযথভাবে ব্যাখ্যা-বিশেস্নষণ করতে পারতেন নির্বিঘ্নে।’
এরপর দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিকসহ শিক্ষকবৃন্দের উপস্থিতে দ্বিতীয়দফা শ্রদ্ধা জানানো হয়। বুকভরা বেদনা নিয়ে সদা হাস্যোজ্জ্বল আবদুল মান্নান সৈয়দের মুখটি শেষবারের মতো দেখার জন্য সবার আকুলতা আছড়ে পড়ছিল সেদিন। পরে বাদ জহুর আজিমপুর কবরে তাকে দাফন করা হয়। এ সময় অনেকের মধ্যে ছিলেন কবির পরিবারের সদস্যসহ তথ্যসচিব ড. কামাল চৌধুরী। হাজার ভক্তের ভালোবাসার হাত ছেড়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ চলে গেলেন চিরনিদ্রার দেশে।
আবদুল মান্নান সৈয়দকে অনেক সময় কোনো একটি বিশেষ রাজনীতিক দলের চিন্তায় বিশ্বাসী বলে মনে করা হয়। যেহেতু তিনি তদানীন্তন সরকারের আমলে নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখান থেকে এই ধারণাটি কারো কারো মোটাদাগের বিশেস্নষণে উত্থাপিত হতে পারে। আবার আরো কোনো ব্যাখ্যা সমালোচনাকামী কারো কারো মাথায় থাকতে পারে। কিন্তু আমরা কেউ ভেবে দেখি না, নজরুল নিয়ে এদেশে যাঁরা প্রবল প্রতাপে গবেষণা করেছেন সেইসব কৃতি মানুষরাই তো এই দায়িত্বে যাবেন। কেউ কেউ আবদুল মান্নান সৈয়দকে মৌলবাদী সত্তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখারও চেষ্টা করেছেন। আবদুল মান্নান সৈয়দ কোন বিশ্বাসের অধিকারী সেটির সবচেয়ে খাঁটি জবাব দিতে পারবেন তিনি নিজেই। সমালোচকরা তাদের স্বভাবের চালে গেঁথে যাবেন অনেক কথার মালাই, এই রীতি নতুন কিছু না। আমার দেখা ২৫ বছরের আবদুল মান্নান সৈয়দকে ধমর্ীয় বা রাজনীতিতে বিশ্বাসী কোনো মানুষ বলে মনে হয়নি কখনো। নিতান্ত সাহিত্যচর্চা ছাড়া তাঁকে আর কোনো কাজে সময় ব্যয় করতে দেখিনি। লিখতে পড়তে ভাবতে ও ধ্যান করতেই যার দিনরাতগুলি চলে যায় তার আর সময় কোথায় অন্যকিছু নিয়ে সময় ক্ষয় করার। মান্নান সৈয়দের নিজের বিচার এখানে উলেস্নখ করা যায়, ‘আমি বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ধারক, আমি হিন্দু ঐতিহ্যের ধারক, আমি মুসলিম ঐতিহ্যের ধারক। আমি বাঙালি এবং আমি মুসলমান। এর কোনো-একটিকে বাদ দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। বাঙালি মুসলমান হিশেবে আমি একটি জটিল মিশ্র ঐতিহ্যের ধারক। ঐতিহ্য যত বিমিশ্য জটিল ও সংঘর্ষময় হয় তত হয় সমৃদ্ধ। আমি সেই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের জাতক। আমি বাঙালি। বাংলা আমার দেশ।’ যাকে নিয়ে এত বিরোধিতা ও সমালোচনার ধারাপাত অব্যাহত তার নিজের মন্তব্যই কেন বিরুদ্ধবাদীরা পড়ে দেখেন না, তা বুঝি না। অবিশ্যি আমরা বিরুদ্ধবাদীদের এই পরচর্চায় বিন্দুমাত্র বিস্মিত হই না, কারণ বিরুবাদীদের কাজ যা, তা তাঁরা চালিয়ে যাবেন, এই তো স্বাভাবিক। আবদুল মান্নান সৈয়দ নিজেই বলেছেন, ‘কেউ কেউ আমার বিরোধিতা করেন। আমার শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস অন্যদের এই বিরোধিতা। অন্যেরা বিরোধিতা যখন করেন না, তখন আমি নিজেই নিজের বিরোধিতা করি। বিরুদ্ধতা, প্রতিকূলতা ছাড়া অগ্রসর হওয়া যায় না। বিরুদ্ধতার ভাগ্য আমার সাহিত্যজীবনের প্রথম থেকে আমাকে তীব্রভাবে সচল রেখেছে, অগ্রসরমান রেখেছে। ধন্যবাদ বিরুদ্ধবাদীদের।’
আবদুল মান্নান সৈয়দ কবিতায় যেমন, গদ্যেও সৃষ্টিশীলতার চিহ্ন রেখে গেছেন অগণন। উপমা-প্রতীক আর রূপকে ঠাসা তাঁর অক্ষরবন্দি সকল সাহিত্যকর্মের ক্যানভাস। তাঁর বর্ণনার অবয়ব হয়ে ওঠে ছবিতে-ছবিতে দৃশ্যময়। লেখার জন্য তাঁর উপকরণ-উপাচারের ঘাটতি নেই। চিন্তা করেছেন লিখেছেন, ভেবেছেন লিখেছেন, প্রেমে মগ্ন হয়েছেন লিখেছেন, বেদনা জমে জমে হূদয় খাক হয়েছে লিখেছেন। লেখাই সুন্দরভাবে বাঁচার পন্থা বাংলা ভাষার এই অক্ষরপ্রেমিকের। কবিতা, কাব্যনাটক ও গল্পের জমিনে তাঁর শব্দ নির্বাচন ও বুনটে তাঁর স্বকীয়তা দুই-বাংলার সাহিত্যে ভীষণ রকমের বিরল। যে কোনো সাধারণ বিষয়ের ওপর সমালোচনাধমর্ী লেখা যখন লিখতেন তার একটি সৃষ্টিশীল সাহিত্যমূর্তি রূপ তিনি অনায়াসে দিতে পারতেন। তাঁর শক্তি তিনি অনুভূতিকে সহজে সাহিত্যের অবয়ব দিতে পারতেন এবং তাঁর অবয়বকৃত সাহিত্য পাঠককে দ্রুত বোধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। অসীম তাঁর উপকরণ, অসম্ভব তাঁর ক্ষমতা। নিজের ভেতর তিনি নিজেই বানিয়ে নিয়েছিলেন আলোদায়ক সূর্য, যার ভেতর থেকে শিল্পরশ্মি ছড়িয়ে পড়ে যখন-তখন। শুরুতে বলেছিলাম দুই দুয়ারের কথা। সামনের দুয়ার দিয়ে ঢুকে তিনি ঘররূপী বাংলাদেশের সাহিত্যভাণ্ডারকে তাঁর জীবনের সম্পূর্ণতা দিয়ে সমৃদ্ধ করে গেছেন। আর সবাইকে নিঃসঙ্গ করে ৫ সেপ্টেম্বর ঘোর সন্ধ্যায় তিনি বেরিয়ে গেলেন পেছনের দুয়ার দিয়ে।
Source: Daily Ittefaq

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s