>স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্য

Posted: November 2, 2010 in ALL ARTICLE

>

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্য

মো শা র র ফ হো সে ন খা ন
 
স্বাধীনতা-উত্তরকালে আমাদের দেশে যেমন রাজনৈতিক উত্থান-পতন ঘটেছে, তেমনি পরিবর্তন ঘটেছে সাহিত্যের পরিমণ্ডলেও। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যের দিকে যদি তাকাই, তাহলে আমরা অনেকটা আশান্বিত হয়ে উঠি। কারণ, আমাদের দেশে রাজনৈতিক কিংবা মতাদর্শিক বিভেদ যতই ঘটুক না কেন, অন্তত একটা জায়গায় আমরা সফলতা অর্জন করেছি। সেটা হলো, বাংলা সাহিত্যের রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে প্রতিষ্ঠিত করা গেছে। আমাদের এই যে সফলতা—এই সফলতা কোনো একক ব্যক্তির দ্বারা যেমন সংঘটিত হয়নি, তেমনি হয়নি কোনো একক দল বা সংগঠনের দ্বারাও। এই বিজয় যেমন আমাদের বাংলা সাহিত্যের বিজয়, তেমনি এই বিজয়ের নায়ক আমাদের দেশের সব লেখক-কবি-সাহিত্যিক। সম্মিলিত একটি আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই আমাদের সাহিত্য আজ পশ্চিমবাংলার খপ্পর আর নাগপাশ থেকে ছিন্ন হয়ে স্ব-মহিমায় ভাস্বর হতে পেরেছে। সুতরাং এই বিজয়ের আনন্দ আমাদের দেশের সব শ্রেণীর লেখকের জন্য সমান প্রাপ্য।
আমাদের সাহিত্যের দিকে তাকালে আমরা হয়তো বা তাত্ক্ষণিক উচ্চারণযোগ্য তেমন কোনো চূড়ান্ত সফলতার কথা বলতে সক্ষম হব না। কিন্তু সেই ব্যর্থতার ছাদ ফুঁড়েও কি কোনো প্রত্যাশিত আলোকরশ্মি আমাদের সাহিত্যের ঘরে প্রবেশ করেনি? নিশ্চয়ই করেছে। তা না হলে ইউরোপীয় কিংবা পশ্চিমবাংলার প্রতাপশালী প্রভাব থেকে আমাদের সাহিত্য মুক্তি পেল কীভাবে?
এক্ষেত্রে সাহিত্যের যে অবদান, তা কোনো একটি দশকের লেখকের একক কোনো অবদান নয়। বরং এই অবদান এ দেশের বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, আশি এমনকি নব্বই দশকের একেবারে নবীনতম লেখকদেরও। আশার কথা, এখনও এই ধারা অব্যাহত আছে।
তবে এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, বাংলাদেশটা কবিতার জন্য যতটা প্রস্তুত, সম্ভবত সাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমের জন্য ততটা নয়। বিগত দশকগুলোর সাহিত্য নিয়ে যদি পর্যালোচনা করা হয়, তাহলে এই সত্যটিই প্রমাণিত হয় যে, আমাদের কবিতাই কেবল অপ্রতিরোধ্য, অকৃত্রিম এবং জীবন্ত এক মাধ্যম। বিশাল এবং বিচিত্র ধারায় আমাদের কবিতা বয়ে চলেছে খরস্রোতা নদীর মতো এবং সেটা চিরবহমান।
স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের কবিতাকে কখনও কখনও মহিমান্বিত করেছে, আবার কখনও বা কবিতায় নিয়ে এসেছে ব্যর্থতা। কিন্তু সব মিলিয়ে আজ দেখা যাচ্ছে, কবিতাই আমাদের সাহিত্যের অগ্রগামী এবং বেগবান একটি মাধ্যম হিসেবে এ দেশের সাহিত্যের প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছে।
কবিতা যেভাবে এগিয়ে গেছে, সাহিত্যের অন্য কোনো মাধ্যম তেমনটি পারেনি। ছোটগল্পের দিকে তাকালে আমাদের ব্যর্থতার ক্ষতটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যদিও কবিতার মতো ছোটগল্পের জন্যও আমাদের দেশটি উর্বর ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেভাবে ফসল ফলেনি। আমাদের দেশে যদিও শক্তিমান গল্পকার ছিলেন, এমনকি এখনও আছেন, তবুও আমরা ঢাকতে পারিনি আমাদের ব্যর্থতার গ্লানি। যারা আছেন, তারাও এক ধরনের হতাশায় মুহ্যমান। এর কারণ সম্ভবত ছোটগল্পের প্রকাশনা সঙ্কট। যদিও এটিকে একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না, তবুও বলব—অনেকটাই তো বটে। সস্তা উপন্যাসের চাপে ছোটগল্পের ত্রাহি অবস্থা। বলতে গেলে, বাজার এখন সেই সস্তা উপন্যাসের দখলে।
গত এক দশকে আমাদের সাহিত্যের সবচেয়ে ক্ষীণতম ধারাটি হয়ে গেছে গল্পের। এই এক দশকেই আমাদের দেশে সস্তা উপন্যাসের রমরমা উত্থান। এখন তো বাজার সয়লাব। প্রকাশকদেরও দৃষ্টি অর্থ এবং বাজারের দিকে। ফলে ছোটগল্প যারা লিখতে পারতেন—ক্রমাগত অবহেলা, বঞ্চনা, আর ঘটনার আকস্মিকতায় তারা অনেকটা থেমে যেতে বাধ্য হয়েছেন। আজ এ কথা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, স্বাধীনতা-উত্তর আমাদের কবিতায় যতটা সফলতা এসেছে, ততটাই ব্যর্থতা জমেছে ছোটগল্পের ক্ষেত্রে। প্রকৃত অর্থে ছোটগল্পের জন্য এখন বড়ই দুঃসময়।
কিন্তু তার চেয়েও কি বড় কোনো ব্যর্থতা আমাদের সাহিত্যে নেই? আছে বৈকি! সেই ব্যর্থতা হলো—আমাদের সমালোচনা সাহিত্য এবং মননশীল প্রবন্ধের ক্ষেত্রে। হাতেগোনা মাত্র দু’একজন ছাড়া, সত্য বলতে এদিকে তেমন কেউ অগ্রসর হননি।
শিশুসাহিত্যের ক্ষেত্রটি অবশ্য কবিতার মতোই অনেকটা উজ্জ্বল। এখন আমাদের শিশুসাহিত্যের জমিনটি বলা যায় ফুলে-ফসলে বেশ ভরে উঠেছে। মনে হয়, এই মাধ্যমটিও আমাদের দেশের এখন প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা অর্জন করেছে। প্রকৃত অর্থে এককালে পশ্চিমবাংলা শিশুসাহিত্যের দিকে আমরা যেভাবে তৃষিত চোখে তাকিয়ে থাকতাম, আজ তার প্রয়োজন অনেকটাই ফুরিয়ে এসেছে।
কিন্তু সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায় হলো—আমাদের দেশে নিয়মিত সাহিত্যপত্রের অভাব। শুধু অভাবই নয়—রীতিমত আকাল।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বিগত দশকগুলোতে আমাদের দেশে রাজনীতি, অর্থনীতি বহুভাবে মোড় নিয়েছে এবং ক্রমাগত সামনে এগিয়ে চলেছে। ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে আমাদের সাহিত্যও। কিন্তু এসব যতটা এগিয়েছে, ততটাই পিছিয়ে গেছে আমাদের সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশনা। এখন তো প্রায় শূন্যের কোঠায়। মোহাম্মদী, সমকাল, সওগাত, পূবালী, কণ্ঠস্বর তো নেই-ই, এমনকি নেই উল্লেখ করার মতো তেমন কোনো মাসিক সাহিত্য পত্রিকা। এই শূন্যতার মধ্যে ‘উত্তরাধিকার’ কিংবা ‘নতুন কলম’ যে কতটা জরুরি, তা বোধ করি আর বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে না।
আমাদের লেখক আছেন, কিন্তু নেই সাহিত্য পত্রিকা। নেই লেখার মতো কাগজ। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা যে কোনোক্রমেই একটি সহিত্য পত্রিকার অভাব পূরণ করতে পারে না, সে কথা বলাই বাহুল্য। অন্যদিকে প্রকাশনা সামগ্রীর উচ্চমূল্য, বিজ্ঞাপনের সঙ্কট, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব—এসব সঙ্কট আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনাকেও ব্যাহত করছে। সুতরাং ভালো লেখক বেরিয়ে আসার পথগুলো রুদ্ধ হয়ে আছে। এসব বন্ধ্যাত্ব দূর করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সাহিত্যের সমূহ ক্ষতি হয়ে যাবে। আাাদের আনন্দ-বিষাদে, শান্তিতে-সংগ্রামে, আমাদের জাতীয় মেধা এবং মননে সাহিত্যই যে অন্যতম প্রাণশক্তি। আমাদের সাহিত্য পেরিয়ে এসেছে বিশ থেকে আশি এবং নব্বইয়ের দশক। এই দীর্ঘ কালস্রোতে আমাদের সাহিত্য ধারণ করেছে সাতচল্লিশের স্বাধীনতা, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধসহ বহু কাল-প্রবাহ।
বাংলা সাহিত্যে প্রাচীনকাল, মধ্যযুগ তো বটেই, নজরুলীয় যুগ এবং তার পরবর্তী ত্রিশ থেকে নব্বই—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমার আলোছায়া নিয়ে আমাদের সাহিত্যের ভুবন।
এত দীর্ঘ সময়ের অর্জিত সাহিত্য নিয়ে এই ক্ষুদ্র পরিসরে তাত্ক্ষণিকভাবে মূল্যায়ন করা আদৌ সম্ভব নয়। কিন্তু সংক্ষেপে বললেও স্বাধীনতা-উত্তর আমাদের সাহিত্য সার্বিক বিচারে যে সফলতা অর্জন করেছে, সেটাকেও খুব খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।
ব্যর্থতাও আছে বৈকি। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো সামনে এগিয়ে যাওয়া। সফলতা আর ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই আমাদের সাহিত্য অতিক্রম করেছে স্বাধীনতা-উত্তর এতগুলো বছর। সামনেই নতুন দিন। নতুন প্রভাত। সাহিত্যের যাত্রাও তো ক্রমবহমান। উত্থান আর পতন, ভাঙা আর গড়া—শেষ পর্যন্ত আমরা সাহিত্যের চূড়ান্ত বিজয়ই প্রত্যাশা করব।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s